প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচি ও এর অপারেশনাল পরিকল্পনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় টিকা সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে প্রথমে হামের টিকার সংকট দেখা দেওয়ার পর এখন দেশব্যাপী জলাতঙ্কের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে।
তিন দিন আগে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত হয় ৬ বছরের শিশু আশা মনি। বুধবার সকালে তাকে নিয়ে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আসেন তার মা আয়শা বেগম। উদ্দেশ্য ছিল জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে তারা পড়েন ভোগান্তিতে। টিকা নিতে আসা শতাধিক মানুষের ভিড় থাকলেও সরকারি সরবরাহ ছিল না।
আয়শা বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনে হাসপাতালে এনে মেয়েকে টিকা দিতে হয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ করা হতো। তবে অপারেশনাল পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ার পর প্রায় এক বছর ধরে সেই কার্যক্রম ব্যাহত রয়েছে। পরে এ সংকট বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
একই চিত্র দেখা গেছে বগুড়াতেও। জেলার এক নারী উদ্যোক্তা তাহমিনা পারভীন শামলী প্রায় দুই মাস আগে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে গুরুতর আহত হন। তিনি প্রথমে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে গেলে টিকা না থাকায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
তিনি বলেন, “দুই হাসপাতালে ঘুরেও টিকা পাইনি। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পর আর কোথাও যাইনি। এখন আতঙ্কে আছি—কখন কী হয়।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “এখন অনেক পরিবারেই পোষা প্রাণী আছে। কামড় বা আঁচড়ের পর টিকা জরুরি। কিন্তু সরকারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষ ঝুঁকিতে পড়ছে।”
জলাতঙ্কের টিকা মূলত কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের পর দেওয়া হয়।
বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম বলেন, “মাসখানেক আগেও জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট ছিল। তবে ১৫ দিন আগে সরকারি সিদ্ধান্তে হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণে টিকা কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার টিকা কেনা যাচ্ছে, কিন্তু এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।”
নওগাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কিছু টিকা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মীর সুফিয়ান বলেন, “যা আছে তা দিয়ে আপাতত চলছে। তবে এটি মোটেও যথেষ্ট নয়।”
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত জলাতঙ্ক টিকার সরবরাহ গত এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এ কারণে মাঝখানে কিছুদিন রোগীদের টিকা দেওয়াও বন্ধ ছিল।
বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে টিকা কিনে রোগীদের দিচ্ছে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “প্রায় চার মাস ধরে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। এখন অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় নিজেদেরই ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে। আজই ইনসেপ্টা ফার্মার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে। তখন সংকট কেটে যাবে বলে আশা করছি।”
জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে এতদিনের অর্জন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
স্বাস্থ্য খাতের কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আগে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হতো। এখন তার পরিবর্তে তুলনামূলক ধীরগতির বার্ষিক ক্রয় প্রক্রিয়া ও হাসপাতালভিত্তিক আংশিক সংগ্রহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “দেশের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে অপারেশনাল প্ল্যানের অনেক সাফল্য রয়েছে। এটি বন্ধ করে দেওয়া ছিল হঠকারী সিদ্ধান্ত। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল। ফোর্থ সেক্টর প্রোগ্রামে মানুষ ও কুকুরের টিকাদানে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় দুই দফা কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এতে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমে আসে। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের বিনিয়োগ কার্যত বিফলে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্য এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়। আগে সরকারি অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় কেন্দ্রীয়ভাবে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই ব্যবস্থা না থাকায় বার্ষিক ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিকা কিনতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ। জুলাই মাসে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হলেও টিকা হাতে পেতে তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক নির্মূলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা। দেশে আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ লাখ কুকুর রয়েছে, যাদের অন্তত তিন দফা টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. হালিমুর রশিদ জানান, এখন থেকে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নয়, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে।
টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও সংকট কাটাতে পদক্ষেপ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সংগ্রহ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ১০ ধরনের ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার ছাড় করেছে। আরও ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের টিকা সংগ্রহ পরিকল্পনা ও ১৫ মাসের বাফার স্টক কৌশল বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আগামী ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সংকট পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্কের টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জরুরি পদক্ষেপের পর হামের টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৪০০ রোগীকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালটিতে ৩০০টির বেশি ভায়াল সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৪ জনে।


