Homeএই মুহুর্তেআল-জাজিরার নিবন্ধ /সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইরানের জন্য সম্ভাবনা নাকি হুমকি

আল-জাজিরার নিবন্ধ /সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইরানের জন্য সম্ভাবনা নাকি হুমকি

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

সৌদি আরব ও পাকিস্তান তাদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে তাতে তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে এখনো চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা না হওয়া অবস্থায় এই পদক্ষেপ নতুন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গত শুক্রবার মক্কায় স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর কোনো বহিরাগত পক্ষ সশস্ত্র হামলা চালালে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বোমা হামলা অভিযান শুরু করার পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর ত্রিপক্ষীয় এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা এল। ওই অভিযান দ্রুত একটি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাহত করে।

তবে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক তাদের চূড়ান্ত চুক্তি প্রণয়নের সময় কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পক্ষকে উসকে দেওয়া থেকে সতর্ক ছিল। তিন দেশই বলেছে, বহু বছরের আলোচনা ও পরিশ্রমের ফল এই চুক্তি। তারা জোর দিয়ে জানিয়েছে, চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট হুমকির কথা উল্লেখ করা হয়নি এবং এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে, পরিচালিত নয়। একই সঙ্গে এটি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি বাতিল বা প্রতিস্থাপনও করছে না।

তেহরানে এই চুক্তি নিয়ে প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত অনেকটাই সংযত। ইরানি কর্মকর্তারা মূলত আঞ্চলিক ও মুসলিম সহযোগিতার বিষয় এবং তাদের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমহ্রাসমান ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার বলেন, মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে ‘আমরা ক্ষতিকর বহিরাগতদের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ সরাসরি মোকাবিলা করতে পারি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এখন সময় শুধু নিজেদের ওপর নির্ভর করার এবং প্রকৃত ভ্রাতৃত্বকে আলিঙ্গন করার।’ তবে কয়েক ঘণ্টা আগে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটির সরাসরি উল্লেখ তিনি করেননি।

তারপরও দীর্ঘমেয়াদে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু কারণ অবশ্যই রয়েছে বলে মনে করেন ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণকারী হামিদরেজা আজিজি। ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের এই সহযোগী গবেষক বলেন, চুক্তিটি কখন এবং কী প্রেক্ষাপটে হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধে সৌদি আরব ইরানঘনিষ্ঠ ইয়েমেনের হুতিদের পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগটি তাই শুধু এই নয় যে, এই চুক্তি সৌদি আরবের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পারে। বরং ভবিষ্যতে এটি ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানের ওপর সমন্বিত চাপ সৃষ্টি করতে এবং এমনকি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে।’

গতকাল রোববার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জাজানে অবস্থিত সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ‘সফল’ ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, আগুন নেভানো হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে আগুনের কারণ সম্পর্কে দেশটি কিছু জানায়নি।

অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের লোহিত সাগরীয় বন্দর আল-মাখায় আঘাত হানে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় অন্তত সাতজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইয়েমেনের এই গোষ্ঠীটি বলেছে, তারা অস্ত্রের গুদামগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লোহিত সাগরে হামলা করছে অথবা সেগুলোর চলাচল ঠেকিয়ে দিচ্ছে।

‘এক শক্তিশালী জোট’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক চুক্তি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে শনিবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানের কূটনৈতিক চিন্তাভাবনার একটি ধারণা দিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। দেশটির পার্লামেন্টারি ও আইনবিষয়ক দপ্তরের মহাপরিচালক হোসেইন নুশাবাদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসনাকে বলেন, মন্ত্রণালয় মূলত এই চুক্তিকে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপস্থিতি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেখছে। নুশাবাদি বলেন, এই চুক্তিকে ‘পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নিরাপত্তা আধিপত্যের পতনের সূচনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওমানে ইরানের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, খুব বেশি দূরের ভবিষ্যতে অতিরিক্ত-আঞ্চলিক শক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়া ক্ষমতার কাঠামোর জায়গা নেবে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে প্রচলিত নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটবে এবং পশ্চিম এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের পরিসর থেকে বেরিয়ে আসবে।’

তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ভালি নাসর মনে করেন না যে, এই মুহূর্তে চুক্তিটি তেহরানের জন্য কোনো হুমকি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে এগুলো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকাবিহীন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপাদান।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি তেহরানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর পাশাপাশি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসেরও একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী উদ্যোগ।’ এখানে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে সৌদি আরবের কাঙ্ক্ষিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে এই স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগকে যুক্ত করেছিলেন।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি অব কাতারের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক মেহরান কামরাভাও একমত যে, ইরানের নীতিনির্ধারকেরা এই মুহূর্তে চুক্তিটিকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে দেখছেন না। বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

কামরাভা আল জাজিরাকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি খুব নতুন কিছু নয়। অন্তত বর্তমান সময়ে এর প্রতীকী গুরুত্বের বাইরে খুব বেশি বাস্তবভিত্তিক বিষয়বস্তু আছে বলেও মনে হয় না। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক হুতি হামলার পরও তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই সৌদি আরবের ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে আগ্রহী হবে না।’

তবে ইরানের সবাই যে এই চুক্তিতে সন্তুষ্ট, তা নয়। দেশটির কিছু কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ও সংবাদমাধ্যমের যুক্তি, শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি তেহরান-সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পক্ষের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন করতে পারে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আজিজি চুক্তিটির বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে আরব রাষ্ট্রগুলো শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, নিরাপত্তা বাইরে থেকে আমদানি করা যায় না; এটি এই অঞ্চলের ভেতরেই গড়ে তুলতে হবে। তবে এখনো একটি রোডম্যাপ অনুপস্থিত।’

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সতর্কতা: ভুল হিসাব একটি ঐতিহাসিক ভুল। ইরান প্রমাণ করেছে, প্রতিটি ভুলের একটি মূল্য আছে। এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো ভারসাম্য।’ কমিশনের আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়িও এক্সে লিখেছেন, ‘তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কাগুজে চুক্তি’ সৌদি আরবকে নিরাপত্তা এনে দেবে না, ‘যেমন বছরের পর বছর একতরফাভাবে আমেরিকানদের ওপর নির্ভর করেও তারা নিরাপত্তা পায়নি।’

ইরান কি সুযোগ হারাচ্ছে?
হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরানের অগ্রাধিকার সম্ভবত হবে এই চুক্তিকে একটি স্পষ্টতই ইরানবিরোধী জোটে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকানো। এর অর্থ হবে তিন দেশের সঙ্গেই আলাদা আলাদা সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি বলেন, তেহরান তার দীর্ঘদিনের সেই অবস্থানও জোর দিয়ে তুলে ধরতে পারে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত বহিরাগত শক্তির বদলে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর দ্বারাই সংগঠিত হওয়া উচিত।

আজিজি বলেন, ‘যদি ওই রাষ্ট্রগুলো এই চুক্তিকে ইরান বা ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অর্থবহ সুরক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে ইরানের জন্য এতে অংশগ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি এই ব্যবস্থা ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি জোট থেকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নেয়, তাহলে ইরানের অংশগ্রহণের প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে।’

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, সুদূর ভবিষ্যতে ইরান নিজেই এই চুক্তিতে সম্ভাব্য সদস্যপদের জন্য আগ্রহী হতে পারে। তবে তার জন্য হরমুজ প্রণালি এবং গোটা অঞ্চলজুড়ে হামলার একটি টেকসই অবসান প্রয়োজন হবে। অন্য দিকে, নিকট ভবিষ্যতে এই জোটে আরও কয়েকটি আঞ্চলিক আরব রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন তারা। মিসরের নাম ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে কায়রোর জন্য এটি একটি জটিল সিদ্ধান্ত হতে পারে।

ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি রিয়াদ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার জন্য স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অনির্ভরযোগ্যতা, ইসরায়েলের নীতিগত পুনর্গঠন এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জবাবে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তুলতে তারা একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।’

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়