Homeএই মুহুর্তেনিজের বাড়ি না থাকলে কি সরকারি চাকরি মিলবে না? আইন কী বলে

নিজের বাড়ি না থাকলে কি সরকারি চাকরি মিলবে না? আইন কী বলে

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর নাগরিকত্ব যাচাই করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এজন্য নিয়োগপ্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা জানতে চাওয়া হয় এবং পুলিশি যাচাইয়ের মাধ্যমে ঠিকানার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানায় নিজের জমি বা বাড়িঘর না থাকলে কি একজন প্রার্থী সরকারি চাকরির জন্য অযোগ্য হয়ে যাবেন? সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের পৈতৃক ভিটেমাটি নেই, কেউ নদীভাঙনের শিকার, কেউ ভূমিহীন, আবার অনেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে নিজেদের আদি ঠিকানায় বসবাস করেন না। জীবিকার প্রয়োজনে তারা শহর কিংবা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। কিন্তু সরকারি চাকরির নিয়োগের সময় স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ জটিলতায় পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থায়ী ঠিকানায় নিজস্ব জমি বা বাড়ি না থাকায় কোনো কোনো চাকরিপ্রার্থী নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বাধার মুখে পড়ছেন।

সম্প্রতি এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মিশন আচার্য। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগের জন্য সুপারিশও পান। কিন্তু নিজেদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় তার নিয়োগপত্র পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসন তা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেয়। গত রবিবার নিজস্ব ভিটেবাড়ি না থাকা সেই মিশন আচার্যকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণের জন্য নিজস্ব জমি বা বাড়ি থাকা কি আদৌ কোনো আইনি শর্ত? নাকি স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা যাচাই করাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট?

সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ একই অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ কিংবা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিককে নিয়োগের অযোগ্য করা বা বৈষম্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব নিয়ে কথা হয় অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, বাংলাদেশের অনেক আইন এখনো পুরনো ও মান্ধাতা আমলের। এসব আইন সংশোধন করে সময়োপযোগী ও আধুনিক করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নাগরিকত্ব ও স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত পুরনো পদ্ধতির পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তার ভাষায়, ‘এখনকার সময়ে মাঠপর্যায়ে গিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে নাগরিকত্ব বা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করার প্রয়োজন নেই। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্নভাবে একজন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় ও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। সে কারণে পুরনো আইনগুলো সংশোধন করে আরও যুগোপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক করা প্রয়োজন।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বললেন, কোনো ব্যক্তির বাড়িঘর নেই কিংবা স্থায়ী ঠিকানায় তাকে পাওয়া যায়নি— শুধু এমন কারণে দীর্ঘ পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে চাকরি পাওয়া একজন প্রার্থীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

এ বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ  বলেছেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থী বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা যাচাই করা সরকারের দায়িত্ব। এজন্য তার স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করা প্রয়োজন। তবে স্থায়ী ঠিকানায় নিজের জমি বা বাড়ি আছে কি না— সেটি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কোনো প্রাসঙ্গিক শর্ত হতে পারে না।

তিনি বললেন, ‘স্থায়ী নাগরিক কি না, সেটি যাচাই করতে হলে তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, কেউ রোহিঙ্গা হিসেবে বা অন্য দেশের নাগরিক হয়েও যাতে চাকরি নিতে না পারেন, সেটি দেখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানায় তার জমি আছে কি না, বাড়ি আছে কি না— সেটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।’

মনজিল মোরসেদ আরও বলেছেন, একজন ব্যক্তি জীবিকার প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বসবাস করতে পারেন। ঢাকায় বা অন্য কোনো শহরে তার বর্তমান বসবাসের ঠিকানা পরিবর্তিত হলেও পৈতৃক বা স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তিত হয়ে যায় না। স্থায়ী ঠিকানায় তিনি নিজে বসবাস না করলেও তার পরিবার, বাবা-মা কিংবা এলাকার মানুষের মাধ্যমে তার পরিচয় ও ঠিকানার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। তার মতে, স্থায়ী ঠিকানায় বাড়ি কিংবা জমি আছে কি না— সেটি কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন নয়। আইনে কোথাও বলা নেই যে সরকারি চাকরি পেতে হলে প্রার্থীর নিজস্ব জমি বা বাড়ি থাকতে হবে। কেউ ভূমিহীন হলেও তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারেন। শুধু জমি বা বাড়ি না থাকার কারণে তাকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

তিনি আরও বললেন, স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য হলো প্রার্থীর দেওয়া ঠিকানার সত্যতা নিশ্চিত করা এবং তিনি বাংলাদেশের নাগরিক কি না— তা অনুসন্ধান করা। কেউ ভুয়া ঠিকানা দিয়ে চাকরি নেওয়ার চেষ্টা করলে সরকার অবশ্যই তা যাচাই করতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়ায় জমির মালিকানা বা বাড়ির অস্তিত্বকে নাগরিকত্বের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা গ্রহণযোগ্য নয়। ঝিনাইদহের মিশন আচার্যের ঘটনার বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কথা জানিয়েছেন। প্রশাসন যদি শেষ পর্যন্ত তার নিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো প্রার্থীকে বঞ্চিত করা হলে আদালতে তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন এই আইনজীবী। অতীতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বললেন, এসব ক্ষেত্রে আদালত হস্তক্ষেপ করে নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়