প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল চরম অস্থিরতা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তখন টালমাটাল ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় সব অঞ্চল। তখন সাম্প্রদায়িকতা শিকার হন ১০ বছরের সাদিক খান ও ছয় মাসের সিকা খানের বাবা ও বোন। আর সাম্প্রদায়িকতা চলাকালে নদীতে ঝাঁপ দেন সাদিক ও সিকা মা।
ঐ সময় কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে ভারত থেকে পাকিস্তানে পালিয়ে যান সাদিক খান। দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে বৈরি সম্পর্কের দু’টি দেশে বসবাস করছেন দুই ভাই। তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু একটি ইউটিউব চ্যানেলের বদৌলতে সাক্ষাৎ হলো দুই ভাইয়ের।
পাকিস্তানের ইউটিউবার নাসির ধীলনের সহায়তায় ও বেশ কিছু ফোনের মাধ্যমে সিকা ও সাদিকের সাক্ষাৎ হয়। এরপর চোখের পানিতে ভাসে দুই ভাইয়ের মুখ।
জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সিকার মতো অনেক পরিবার। তখন সাম্প্রদায়িক হত্যার শিকার হন সিকার বাবা ও বোন। ঐ সময় পাকিস্তানে পালিয়ে যান ১০ বছরের সাদিক।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের পশ্চিমের শহর ভাতিণ্ডায় ইটের তৈরি একটি বাড়িতে বসে সিকা খান বলছিলেন, আমার মা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজন আমাকে বড় করেন।
দাঙ্গার সময় পরিবারের একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য ভাই সাদিক কোথাও আছে বলে বিশ্বাস ছিল সিকা খানের। কিন্তু সাদিকের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না সিকা। তিন বছর আগে প্রতিবেশী এক চিকিৎসক তার ভাইকে খুঁজে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
পাকিস্তানের একটি মন্দির পরিদর্শনের জন্য ভিসা ছাড়াই সীমান্ত পার হওয়ার অনুমতি পায় ভারতের শিখ ধর্মাবলম্বীরা। সেই সময়ই ভাগ্য খুলে যায় সিকার। গত জানুয়ারি মাসে করতারপুর করিডরে দুই ভাইয়ের সাক্ষাৎ হয়।
২০১৯ সালে ওই করিডর খুলে দেওয়ার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো এক হওয়ার সুযোগ পায়।
হাতের মুঠিতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পারিবারিক একটি ছবি ধরে রেখে সিকা বলেন, আমি ভারত থেকে এসেছি। আর পাকিস্তান থেকে এসেছে সাদিক। কিন্তু আমাদের পরস্পরের জন্য রয়েছে অনেক ভালোবাসা। প্রথমবার যখন আমাদের দেখা হলো, তখন আমরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম। ভারত ও পাকিস্তানের বৈরিতা নিয়ে আমরা ভাবি না। আমরা ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়েও ভাবি না।
ভাইকে খুঁজতে সিকাকে সাহায্য করেন ৩৮ বছরের ইউটিউবার ধীলন। তিনি পাকিস্তানে পেশায় কৃষক ও আবাসন ব্যবসার এজেন্ট। ধীলন বলেন, ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি প্রায় ৩০০ পরিবারকে এক করেছেন। পাকিস্তানে আরেক শিখধর্মাবলম্বী ভূপিন্দর সিং তাকে সহায়তা করেন।
ধীলন বলেন, আমি আয় করতে এমন কাজ করি না। মনের স্নেহ ও আবেগ থেকে পরিবারগুলোর সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেই। ধীলন আরো বলেন, আমি মনে করি, এসব ঘটনা আমাদের নিজেদের ঘটনা, পূর্বপুরুষদের ঘটনা। তাই বিচ্ছেদ হওয়া এসব মানুষকে এক করাটা আমাদের পূর্বসূরিদের ইচ্ছাপূরণ।
পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে ধীলন আরো বলেন, দুই ভাইয়ের সাক্ষাৎ দেখতে প্রায় ৬০০ মানুষ জড়ো হন।করতারপুরে তারা যখন এক হলেন তখন দুই ভাইকে এক হতে দেখে অনেকেই কেঁদে ওঠেন।
ব্রিটিশদের শাসনের শেষ দিকে পাকিস্তান থেকে হিন্দু ও শিখধর্মাবলম্বীরা ভারতে পালিয়ে যায়। আর মুসলিমরা পাকিস্তানের দিকে পালিয়ে যায়।


