প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, কিডনি রোগ মোকাবিলায় শুধু ডায়ালাইসিস মেশিন বাড়ানো বা নতুন হাসপাতাল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের বিকল্প নেই।
রোববার (৭ জুন) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ক সচেতনতামূলক সেমিনার’ এ তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেছেন, কিডনি রোগ এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি দেশের মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামে যোগদানের পর থেকেই কিডনি রোগ-সংক্রান্ত অসংখ্য আবেদন, অভিযোগ ও মানবিক সংকটের ঘটনা তার সামনে এসেছে। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে এবং তিনি নিজেও এ নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন।
তিনি বলেন, আমি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি যে কিডনি রোগ আগামী দিনে একটি বড় জাতীয় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
জেলা প্রশাসক বলেন, কিডনি রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, কিডনির প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অনেক মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন।
ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। আমরা সবাই জীবনের নানা লক্ষ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কিন্তু কখন কোন রোগ আমাদের আঘাত করবে, সে বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি প্রায় নেই। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে কিডনি রোগ অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরে ডেপুটি সিভিল সার্জন কিডনি রোগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে জানানো হয়, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন এবং প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার রোগী কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়ে পৌঁছান।
এতে আরও জানানো হয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, কিডনির প্রদাহ, সংক্রমণ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কিডনি রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সেমিনারে কিডনি রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা।
তিনি বলেন, কিডনি রোগের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি প্রত্যেক নাগরিককে বছরে অন্তত দুইবার রক্ত ও প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানান এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক ইমরান বিন ইউসুফ, অধ্যাপক প্রবীর কুমার দত্ত, অধ্যাপক এম এ কাশেমসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সচেতনতা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কোর কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মাহমুদ এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার এ বি সিদ্দিক। তারা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি স্থায়ী সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।


