শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬
spot_img
Homeমুল পাতাএল নিনো; দ্রুত ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের

এল নিনো; দ্রুত ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছেন, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

এই প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন চক্রটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির নির্গমনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি এল নিনো বিশ্বজুড়ে মারাত্মক আবহাওয়ার ধরনগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, এ ঘটনা ১৯৯৭ সালের রেকর্ড গড়া এল নিনোর সমকক্ষ বা তার চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। সেই এল নিনোর কারণে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। এটি নিরক্ষরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার একটি ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরনে গভীর প্রভাব ফেলে।

সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরের শেষ শরৎ এবং শীতের শুরুতে এই এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। এমনটি ঘটলে এটি ১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নথির সবচেয়ে বড় এল নিনো ঘটনাগুলোর মধ্যে স্থান পাবে।

ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যাবি ফ্রেজিয়ার ব্যাখ্যা করেন, এল নিনোর উষ্ণ ও গভীর সমুদ্রের পানি পৃষ্ঠে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ নিয়ে আসে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে নানা ধরনের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঘটনা আরও শক্তি পায়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পরিস্থিতি খুব দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি এল নিনোকে ‘জলবায়ু সংকটের জরুরি সতর্কসংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, ‘এল নিনোর পরিস্থিতি উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও ঘি ঢেলে দেবে।’

এল নিনোর প্রভাবে কেউ লাভবান হবে, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত

এই আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়।

এল নিনো সাধারণত আটলান্টিক মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের তীব্রতা কমিয়ে দেয়, যদিও একেবারে বন্ধ করে না। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে এটি ঘূর্ণিঝড়ের কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেবে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল এবং মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূল কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। অন্যদিকে হাওয়াই ও অন্যান্য দ্বীপাঞ্চল বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানান ফ্রেজিয়ার।

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিনের খরায় ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্য এর কিছু সুবিধা পেতে পারে।

তবে অন্য অনেক অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।

পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে, যেখানে কয়েক দশক আগে প্রথম এল নিনোর প্রভাব লক্ষ্য করা হয়েছিল, সেখানে অতিভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকাল আরও উষ্ণ হতে পারে।

ভারতে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে খরা, দাবানল ও অতিরিক্ত তাপ অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং এল নিনো বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আজহার এহসান বলেন, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। সেখানে তীব্র খরার পর বিপজ্জনক মাত্রার ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে এল নিনোর কারণে দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতসহ আরও তীব্র ঝড় হতে পারে।

তবে মার্কিন জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের পরিচালন শাখার প্রধান জন গটশাল্ক বলেন, সামগ্রিকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের জন্য কিছু সুবিধাও বয়ে আনতে পারে।

বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোবির গবেষণা প্রধান এবং আবহাওয়াবিদ মাইকেল ফেরারি বলেন, সয়াবিনসহ বিভিন্ন শস্য ও বীজ উৎপাদনের জন্য ১৮টি প্রধান কৃষি অঙ্গরাজ্যে পরিস্থিতি অনুকূল বলে মনে হচ্ছে।

তবে দুগ্ধ খামার ও গবাদিপশু খাতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে মিশ্র।

গটশাল্ক বলেন, উত্তরাঞ্চলীয় রকি পর্বতমালা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, যেখানে তুষারপাতের ঘাটতি রেকর্ড মাত্রায় রয়েছে, সেখানে শক্তিশালী গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব সাধারণত শীতকালে দেখা যায়। সে সময় দক্ষিণাঞ্চল বেশি আর্দ্র হয়ে ওঠে, আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও শুষ্ক থাকে।

তবে সামগ্রিকভাবে এই আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করতে পারে বলে মন্তব্য করেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ মার্শাল বার্ক।

বেশ কয়েকজন জলবায়ু বিজ্ঞানী পূর্বাভাস দিয়েছেন, এই এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাবের কারণে ২০২৭ সাল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, এল নিনো তার সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছাবে শরৎ বা শীত মৌসুমে।

বার্ক বলেন, ‘আমাদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়।’

শুরু থেকেই শক্তিশালী লক্ষণ

বিজ্ঞানীরা বলেন, এল নিনোর কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার মাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে এটি কখন গড়ে ওঠে তার ওপর।

সাধারণত এল নিনো গ্রীষ্মকালে সৃষ্টি হয়, শরতের শেষভাগ বা শীতের শুরুতে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায় এবং পরবর্তী বসন্তে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়।

তবে এহসানের গবেষণা দল পূর্বাভাস দিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা শক্তিশালী প্রাথমিক লক্ষণের কারণে এই এল নিনো এক থেকে দুই মাস আগেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল ভেক্কি বলেন, এ ধরনের বড় এল নিনো সাধারণত দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়।

তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর থেকে উষ্ণ পানি উপরের দিকে উঠে আসাসহ প্রাথমিক লক্ষণগুলো এতটাই শক্তিশালী ও স্পষ্ট যে প্রায় সব পূর্বাভাসদাতা একই ধরনের অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, বছরের এই সময়ে সাধারণত এল নিনো নিয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাসে ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু এবার প্রায় সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

ফ্রেজিয়ার এবং আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী বলেন, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর কারণে পৃথিবী উষ্ণ হয়ে ওঠায় ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এল নিনো দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে তিনি বলেন, বর্তমান এল নিনো সেই প্রবণতার অংশ কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি।

আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হওয়ার আগেই এই এল নিনোকে বিভিন্ন নামে ডাকা শুরু হয়েছে।

কেউ একে ‘সুপার এল নিনো’ বলছেন, আবার কেউ ‘গডজিলা এল নিনো’ নাম ব্যবহার করছেন।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এহসান বলেন, ‘ভয় পাওয়ার পরিবর্তে আমরা মানুষকে প্রস্তুত থাকতে বলতে পারি।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়