প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার হোসনাবাদে দেশের একমাত্র এভিয়ারি অ্যান্ড ইকো পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ক্যাবল কার। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ভাঙচুর ও লুটপাটের পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে এটি বন্ধ রয়েছে।
প্রায় ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১২ কেবিনের ক্যাবল কারটিতে চড়ে মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপর দিয়ে পার্কের পাহাড়, বন ও জলাশয়ের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ ছিল। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ এই ক্যাবল কার ছিল স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ক্যাবল কারের দুটি স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি লুট হয়ে গেছে। পাশাপাশি কেবিনের কাচ, টিকিট কাউন্টার, নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জেনারেটর কক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পার্ক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ক্যাবল কারটি মেরামত করে আবার চালু করতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
ভাঙচুর-লুটপাটে ক্যাবল কারের দুই স্টেশনে ক্ষতি প্রায় ৩ কোটি টাকা
এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের প্রবেশমুখ পেরোলেই ক্যাবল কারের লোয়ার স্টেশন। একসময় দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকা জায়গাটি এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। টিকিট কাউন্টার, নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জেনারেটর কক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে কাচের টুকরো ও আবর্জনা। লোয়ার স্টেশনে থাকা সাতটি কেবিনের কাচও ভাঙা। কেবিনের ভেতরে পড়ে আছে নষ্ট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের আপার স্টেশনেও একই চিত্র। সেখানে পাঁচটি কেবিন ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষের দরজা-জানালাসহ ভেতরের বিভিন্ন অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। একসময় যেসব স্টেশন থেকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে ক্যাবল কার চলত, সেগুলো এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে।
পার্কের কর্মচারীরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৭ আগস্ট টানা তিন দিন ক্যাবল কারের দুই স্টেশনে ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। এ সময় মোটর, ব্রেক, সার্কিট বোর্ডসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর ও লুট করা হয়।
বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে পুরো এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কে ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার। এর মধ্যে ক্যাবল কারের দুই স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। লোয়ার স্টেশন ও কন্ট্রোল রুমে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ এবং আপার স্টেশন ও কন্ট্রোল রুমে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার।
তবে এই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ক্যাবল কারটি আবার চালু করার প্রকৃত ব্যয় নয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যাওয়ায় কোন কোন অংশ প্রতিস্থাপন করতে হবে, তা জানতে কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ক্যাবল কারটি মেরামতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, “এটি মেরামত অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করতে অভিজ্ঞ কারিগরি দল আনতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হবে; এতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সেই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।”
চালুর পর থেকেই বারবার বিপর্যয়
চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের দক্ষিণ নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ৫২০ একর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চলে এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর।
এর আগে ২০১২ সালে বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্যাবল কার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এটি দর্শনার্থীদের জন্য চালু করা হয়। সর্বোচ্চ ২০টি কেবিন পরিচালনার সক্ষমতা থাকলেও একসময় ১২টি কেবিন সচল ছিল। প্রতিটি কেবিনে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রী উঠতে পারতেন।
তবে চালুর পর থেকেই নানা কারণে বারবার বন্ধ হয়েছে ক্যাবল কারটি। চালুর মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০১৫ সালে ভারী বর্ষণে আপার স্টেশনের একটি পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে গেলে নিরাপত্তার কারণে এটি বন্ধ রাখা হয়। পরে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটিতে আবারও অচল হয়ে পড়ে ক্যাবল কারটি।
প্রায় দুই বছর পর মেরামত শেষে ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এটি আবার চালু হয়। কিন্তু মাত্র ১১ মাসের মাথায় ২০২৪ সালের আগস্টে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ফের বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালু হয়নি।
অর্থাৎ চালুর পর প্রায় এক যুগে ক্যাবল কারটির কার্যক্রম বারবার থেমেছে—কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবকাঠামোগত সমস্যায়, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটিতে, আর সর্বশেষ হামলা ও যন্ত্রাংশ লুটের ঘটনায়।
এদিকে পার্ক সম্প্রসারণে ২০১৮ সালে ১২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেলেও ক্যাবল কারের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর পরিকল্পনা পরে বাদ দেয় বন বিভাগ। বুয়েটের কারিগরি দলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর কারিগরি জটিলতার কারণে পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়।
পর্যটক কমেছে
ক্যাবল কারটি ছিল পার্কটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট ওপরে ঝুলন্ত কেবিনে চড়ে দর্শনার্থীরা পাহাড়ি এলাকার ওপর দিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন। পুরো যাত্রায় সময় লাগত প্রায় সাত মিনিট। চালু থাকাকালে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের মূল্য ছিল ২৩০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ১১৫ টাকা।
দেশে সরকারি পর্যায়ে প্রথম ক্যাবল কার চালু হয় ২০১০ সালে বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে। সেটির দৈর্ঘ্য ৪৮৮ মিটার। সে তুলনায় রাঙ্গুনিয়ার ক্যাবল কারটি ছিল প্রায় পাঁচ গুণ দীর্ঘ।
এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ক্যাবল কার চালু থাকাকালে প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা কখনো ৫০০ থেকে ৭০০, আবার কখনো ১ হাজার ছাড়িয়ে যেত। বর্তমানে ক্যাবল কার বন্ধ থাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যা ১০০-এর নিচে নেমে এসেছে।
ক্যাবল কারের টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকায় এ খাত থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয়ও বন্ধ রয়েছে। ক্যাবল কারের আকর্ষণে আসা দর্শনার্থীদের একটি অংশ এখন আর পার্কে আসছেন না। ফলে ক্যাবল কারের আয় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কমেছে পার্কের সামগ্রিক আয়ও।
এদিকে সম্প্রতি মেসার্স আইয়ুব অ্যান্ড ব্রাদার্সকে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য পার্কটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ১ অক্টোবর ২০২৭ পর্যন্ত ইজারার আওতায় রয়েছে প্রবেশ ফি আদায়, তিনটি দোকান, ২ হাজার ৩০৪ বর্গমিটার পার্কিং এলাকা ও একটি লেক পরিচালনা। তবে ক্যাবল কারটি অচল থাকায় সেটি ইজারার আওতায় রাখা হয়নি।


