Thursday, July 2, 2026
spot_img
Homeসংবাদকোন পথে যাচ্ছে গাজা সংকট

কোন পথে যাচ্ছে গাজা সংকট

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার একটি হাসপাতালে মঙ্গলবারের হামলায় কমপক্ষে পাঁচ শত মানুষ নিহত হয়েছেন। এরপর বুধবার রাতেও গাজার আরেকটি হাসপাতালের কাছে হামলা হয়েছে। অক্টোবরের ৭ তারিখ থেকে শুরু হওয়া সংকট আরো তীব্রতর হচ্ছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় গত ১৩ দিনে নিহত হয়েছেন তিন হাজার ৭৮৫ ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী। নিহতদের মধ্যে এক হাজার ৫২৫ শিশু এবং এক হাজার নারী।

শুক্রবার (২০ অক্টোবর) গাজায় ইসরায়েলি হামলা ১৪তম দিনে গড়িয়েছে। সর্বশেষ গাজায় হাসপাতালে বিমান হামলার পর সংকট নিরসনের সম্ভাবনা আরো উবে গেছে। এদিকে, ইসরায়েল বা হামাস কারো মধ্যেই সমঝোতার কোন মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে জিম্মিদের পাশাপাশি সেখানকার বেসামরিক নাগরিক ও বাসিন্দাদের কী হবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা গেছে।

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেখান থেকে হামাসের বন্দুকধারীরা অন্তত ১৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়, যাদের গাজার বিভিন্ন গোপন জায়গায় রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্করাও রয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরায়েল যদি এখন গাজায় পূর্ণ মাত্রায় সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে এসব জিম্মি বেঁচে থাকার আর সম্ভাবনা থাকবে না।

ইসরায়েলি বাহিনী একটি স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গাজা সীমান্তে সেনা মোতায়েন, ভারী আর্টিলারি এবং ট্যাংক জড়ো করেছে সেনারা।

সমঝোতার ইঙ্গিত নেই

এমন পরিস্থিতিতে কাতার, মিশর ও সম্ভবত আরো কয়েকটি দেশ জিম্মিদের একাংশের মুক্তির জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি কথাও শোনা যাচ্ছে যে হামাস নারী ও শিশু বন্দীদের মুক্তি দেবে এবং বিনিময়ে ইসরায়েল ৩৬ নারী ও কিশোর বন্দীকে ছেড়ে দেবে।

তেলআবিবের রেইচম্যান ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট ফর পলিসি অ্যান্ড স্ট্রাটেজির সিনিয়র বিশ্লেষক মাইকেল মিলস্টাইন বলছেন যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যে কোন মূল্যে জিম্মি হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত পাওয়াই হতো ইসরায়েলের বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো সামরিক হুমকি হিসেবে হামাসকে নির্মূল করা।

ইতোমধ্যে উভয় পক্ষেই উত্তেজনা ও ক্রোধ বাড়ছে তবে কারোই মধ্যেই সমঝোতার মানসিকতা নেই বললেই চলে। ইসরায়েলের বাসিন্দারা হতভম্ব ও ক্ষুব্ধ যে বন্দুকধারীরা কীভাবে সহজেই দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে ঠাণ্ডা মাথায় প্রায় বারশো মানুষকে হত্যা করতে পারলো হামাস সদস্যরা।

এদিকে ফিলিস্তিনিরা, শনিবারের পর থেকে গাজায় দুই হাজারের মতো বিমান হামলায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুতে ক্রোধে ফুঁসছে। সেই সঙ্গে অবরুদ্ধ ও জনবহুল এই উপত্যকায় তেল, বিদ্যুৎ, পানি ও ঔষধ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

সতর্কতা ছাড়া বিমান হামলা চালিয়ে ইসরায়েল কোন বেসামরিক নাগরিক হত্যা করলে জবাবে জিম্মিদের একজন একজন করে হত্যার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হামাস। তবে এমন কিছু তারা করেছেন তেমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ইসরায়েলের দিক থেকে সংযমের কোন আভাস নেই। গাজার বড় অংশকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। তবে মাইলস্টেইন বিশ্বাস করেন যে হামাস হয়তো নারী, শিশু ও বয়স্কদের আটকে রাখতে আগ্রহী নাও হতে পারে।

কারণ ব্যাপক বিমান হামলার মধ্যে তাদের যথার্থভাবে যত্ন নেয়া সহজ নাও হতে পারে। হামাস তাদের অবস্থানও গোপন রাখার চেষ্টা করছে যাতে করে সেখান থেকে ইসরায়েল কোন তথ্য না পেতে পারে।

এর পরিবর্তে, হামাস চাইবে তাদের হাতে জিম্মি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পূর্ণ সুবিধা আদায় করতে। আলোচনা হলেও যাতে এদের মুক্তির বিনিময়ে বড় কিছু আদায় করা যায়।

সব বিকল্পই কঠিন

জিম্মি নাগরিকদের প্রসঙ্গে বড় ধরনের সংকটে ইসরায়েলি সরকার। এখন কী সামরিক উদ্ধার অভিযান হবে, যেখানে কিছুটা ঝুঁকিও থাকবে? নাকি এটা দীর্ঘায়িত হবে, যতক্ষণ না হামাস বিমান হামলায় দুর্বল হয় যা তাদের একটি সমঝোতায় আসতে আগ্রহী করে তুলবে। এসব বিকল্পগুলোর কিছু ঝুঁকি আছে। যদিও জিম্মিদের টানেল বা বাঙ্কারে রাখা হয়েছে বলে মনে করা হয়, তারপরেও বিমান হামলা থেকে তারা সুরক্ষিত নাও হতে পারে।

এছাড়া জিম্মিকারীরা তাদের মেরে ফেলতে পারে- এ সম্ভাবনা সবসময়ই থেকে যায়। রাগের কারণেও এটি হতে পারে, আবার তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে-এই ভয় থেকেও হতে পারে। নাইজেরিয়াতে এমনটি ঘটেছিলো ২০১২ সালে। যুক্তরাজ্য-নাইজেরিয়ান স্পেশাল ফোর্স জিহাদিদের হাত থেকে দুজন জিম্মিকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছিলো।

ইসরায়েল শিগগিরই একটি হোস্টেজ সিচুয়েশন রুম স্থাপন করেছে। হামাস যাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে গেছে, তাদের বিস্তারিত তথ্য নেয়া হয়েছে।

যে জিম্মিদের ইসরায়েলের ভূখণ্ডেই রাখা হয়েছিলো, বন্দুকধারীদের হত্যা করে তাদের মুক্ত করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের স্পেশাল ফোর্স। তাদের জিম্মিকারী হামাসের সবাইকে মারা হয়েছে।

মাইকেল মিলস্টাইন বিশ বছর ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলছেন যে ‘গাজার সব ঘরবাড়ি ও রাস্তার তথ্য আমাদের হাতে নেই’। সেখানেই হামাস নিজেদের ও তাদের জিম্মিদের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আড়াল করে রাখতে সক্ষম হবে।

জিম্মি উদ্ধারে ইসরায়েলের বিশেষ দক্ষতা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৫৭ সালে তৈরি করা গোপন সায়েরেত মাতকাল ইউনিট অনেকটা আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স কিংবা ব্রিটেনের এসএএস’র মতো। ১৯৭৬ সালে উগান্ডার বিমানবন্দরে ছিনতাই হওয়া একটি বিমান থেকে এর কমান্ডোরা জিম্মিদের উদ্ধার করেছিলো। ওই ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন জোনাথন নেতানিয়াহু। তিনিই কমান্ডোদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি ওই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার ভাই।

এখন পুরো সিদ্ধান্তই তার হাতে, তিনি আলোচনার মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্ত করবেন নাকি শক্তি প্রয়োগ করে করবেন।

কঠিনতম জিম্মি সংকট

যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে বলে খবর আসছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এসেছে দেশটির বিশেষ রণতরী। অন্যদিকে হামাস অসম যুদ্ধেও তার সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রের শক্তির মুখেও নিজেদের প্রমাণ করেছে।

শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত যোগাযোগ এড়িয়ে তারা ৭ অক্টোবর বড় হামলা করতে সক্ষম হয়েছে। যেসব বন্দুকধারীরা ১৫০ জনকে জিম্মি করেছে তাদেরকেও সম্পূর্ণ অগোচরে রাখা হয়েছে। ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরত্বে রাখা হয়েছে জিম্মিদেরও।

‘এটা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন নেই যে ইসরায়েল এবার ইতিহাসের কঠিনতম জিম্মি সংকট মোকাবিলা করছে,’ বলেন বিশ্লেষক।

সূত্র: বিবিসি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়