প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ২৫ বছর মেয়াদি ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় এই দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, মাস্টারপ্ল্যানে আনোয়ারা, পটিয়া ও হাটহাজারী উপজেলা ঘিরে বিশেষায়িত শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণার মাধ্যমে স্যাটেলাইট টাউন এবং নতুন বাণিজ্যিক জোন তৈরির পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০৪০ সালের মধ্যে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় নতুন ড্রেনেজ চ্যানেল নির্মাণের পাশাপাশি ১২৫ কিলোমিটার প্রাকৃতিক খাল এবং প্রায় ৫৯৪ কিলোমিটার আরআরসি ড্রেন পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করা হবে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। আইওটি-ভিত্তিক সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় ‘সিল্ট ট্র্যাপ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত ব্লকেজ শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিডিএ সূত্র জানায়, ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ইতোমধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের পরিচালক ও উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও সে অনুযায়ী উন্নয়ন হয়নি। পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এই মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পুকুর ভরাট ও অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তৈরি করছে। এ সমস্যা সমাধানে পুরো এলাকাকে ছয়টি কৌশলগত জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে জোনাল অফিস থেকেই সেবা পাওয়া যাবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে তদারকি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং নাগরিক ভোগান্তি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘লিকুইফ্যাকশন হ্যাজার্ড ম্যাপ’ প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপদ স্থাপনা নির্মাণ নিশ্চিত করা যাবে। ভবিষ্যতে ভবন নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন এই মানচিত্রের ভিত্তিতেই দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ড্রোন ও মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হবে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) নগর মানচিত্র, যা ভবনের উচ্চতা, জমির ব্যবহার, অবকাঠামো এবং পরিকল্পনার সীমারেখা নির্ধারণে সহায়ক হবে। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


