Homeসংবাদবনানীতে ফ্ল্যাটের চেয়ে কবরের জমির দাম বেশি

বনানীতে ফ্ল্যাটের চেয়ে কবরের জমির দাম বেশি

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোর একটি বনানী। চারপাশে সুউচ্চ ভবন, ঝকঝকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর আধুনিক নাগরিক সুবিধা—সব মিলিয়ে আবাসন ও ব্যবসার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণীয় এ এলাকা। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপও এখানকার আবাসন বাজারের চাহিদায় বড় ধরনের ভাটা ফেলতে পারেনি। তবে বনানীর এ ব্যয়বহুল নগরজীবনের মাঝেই তৈরি হয়েছে আরেকটি অদ্ভুত বাস্তবতা, এখানে জীবনের শেষ ঠিকানার জায়গাটির দাম অনেক ক্ষেত্রে একটি অভিজাত ফ্ল্যাটের চেয়েও বেশি।

বনানীতে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে কমবেশি ৫ কোটি টাকা। বিপরীতে মাত্র ২০ বর্গফুটের মতো জায়গায় একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি বড় আবাসিক ফ্ল্যাটের মূল্যের কাছাকাছি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচালিত বনানী কবরস্থানে গেলেই চোখে পড়ে অসংখ্য কবর। কোথাও পুরনো চিহ্ন, কোথাও নতুন দাফন। এর মধ্যেই প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন কবরের জায়গা সম্পর্কে খোঁজ নিতে। কেউ পরিবারের কোনো সদস্যের জন্য আগাম ব্যবস্থা করতে চান, কেউ নিজের জন্যই ভবিষ্যতের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু জায়গার সংকটের কারণে তাদের বেশির ভাগকেই ফিরতে হচ্ছে হতাশ হয়ে।

প্রায়ই সেখানে জায়গার খোঁজে আসেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৬৫ বছর বয়সী শহিদুল ইসলাম।  তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কবরস্থানে ঘুরছি। মৃত্যুর আগে নিজের জন্য একটা কবরের জায়গা কিনে রাখতে চাই। কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। ৪-৫ কোটি টাকা দিতেও রাজি ছিলাম। তারপরও সাড়ে তিন হাত জায়গার এক টুকরো জমি মিলছে না। মানুষ জীবনে কত কিছু কেনে। কিন্তু শেষ ঠিকানার জন্য একটা ছোট জায়গাও যদি নিশ্চিত করতে না পারে, সেটা কষ্টের।’

স্থায়ী কবরের জন্য জমির সংকট দিন দিনই তীব্র হচ্ছে। বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে কবরের জায়গা তৈরির সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বিদ্যমান জায়গাকেই বিভিন্ন মেয়াদে ব্যবহারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জায়গার স্বল্পতার কারণে কোনো স্থায়ী কবর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে নতুন করে দাফন করতে হলে নির্ধারিত ফি হিসেবে দিতে হয় ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। ১৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। ২৫ বছরের জন্য এ ব্যয় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা দাঁড়াচ্ছে বলে জানায় কবরস্থান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

বনানীর চিত্রটি অবশ্য ঢাকার সামগ্রিক কবরস্থান সংকটেরই একটি প্রতীক। দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর জনসংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সে অনুপাতে কবরস্থানের পরিমাণ বাড়ছে না। আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিক্ষা ও চিকিৎসা অবকাঠামোর জন্য নগরের জমির ব্যবহার নিয়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও কবরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে জায়গা ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মানুষের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবাগুলোও নগর পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। সে বিবেচনায় কবরস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা। অথচ ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে কবরস্থানের চাহিদা ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনকে সমন্বয় করে কোনো কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো গড়ে ওঠেনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কবরস্থান একটা আবেগের জায়গা। প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন এখানে। অন্তত এক-দুই পুরুষ পর্যন্ত কবরস্থান সংরক্ষণ করাটা মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। কোনো উন্নত জাতিই তাদের আবেগকে পিষে ফেলে এগিয়ে যায়নি। আমাদের শহর বড় হচ্ছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু আমাদের আবেগের জায়গাগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।’

কবর সংরক্ষণের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌ঢাকায় ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে দেড় কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায়, কবরস্থান সংকট ঢাকায় কত তীব্র। এত উচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে কেন? মানুষ যেন কবর সংরক্ষণ করতে নিরুৎসাহিত হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কবরস্থানকে কমিউনিটি স্পেস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইরানে ও উজবেকিস্তানে এ রকম চর্চা আছে। আমাদের পরিকল্পনা নেই, ব্যবস্থাপনাও নেই।’

প্রপার্টি কেনাবেচা ও ভাড়ার অনলাইন মার্কেটপ্লেস বিডিপ্রপার্টিসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বনানীতে দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম অবস্থানভেদে ৪ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। একই আয়তনের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ বনানী কবরস্থানে ৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের একটি কবরের ২৫ বছরের সংরক্ষণ ফি প্রায় ৪ কোটি টাকা। প্রায় ২০ বর্গফুটের হিসাবে প্রতি বর্গফুট কবরের জায়গার মূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি টাকারও বেশি।

কবরস্থানের জায়গার এ অস্বাভাবিক মূল্য মূলত রাজধানীতে জমির সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক দশক আগেও ঢাকার কবরস্থানগুলোয় তুলনামূলক কম অর্থে স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা বরাদ্দ পাওয়া যেত। সময়ের সঙ্গে রাজধানীর জনসংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। বিপরীতে বাড়েনি কবরস্থানের জমি। ফলে নতুন করে স্থায়ী কবর বরাদ্দ এখন কার্যত বন্ধের পর্যায়ে।

সম্প্রতি বনানী কবরস্থানে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যাংক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জীবনের বড় অংশ কেটে গেছে। এখন আর বড় ফ্ল্যাট বা সম্পত্তির চিন্তা নেই। শুধু চাই মৃত্যুর পর পাশাপাশি (স্বামী-স্ত্রী) শুয়ে থাকার মতো ছোট একটা জায়গা। কিন্তু কবরের জমিও এখন দুর্লভ সম্পদ হয়ে গেছে।’

বনানী কবরস্থানে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন কবরের জায়গা নিতে আসেন। অনেকেই বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে রাজি থাকলেও জায়গার অভাবে তাদের আশ্বাস দেয়া সম্ভব হয় না। তার ভাষায়, ‘টাকা থাকলেই সব পাওয়া যায়—এ ধারণা যে এখানে এসে ভুল প্রমাণিত হয়।’

কবরস্থানের মহরার দায়িত্বে থাকা হারুনুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনানী কবরস্থানে বর্তমানে নয় হাজারের বেশি কবর রয়েছে। নতুন জায়গা না থাকায় পুরনো কবরই পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। দুই বছর পর একটি কবরের ওপর আরেকটি কবর দেয়া হয়। আমাদের রেকর্ডে আছে, কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।’ জীবিত অবস্থায় কবর কিনে রাখার প্রবণতাও জায়গা সংকটের কারণে এখন প্রায় বন্ধ বলে জানান তিনি।

রাজধানীর আরেক বড় কবরস্থান আজিমপুরেও একই চিত্র। প্রায় ৩২ একর জমির ওপর বিস্তৃত এ কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কবর। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ মৃত ব্যক্তির দাফন হয়। জায়গা সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবে কবর স্থায়ী করার প্রক্রিয়াও প্রায় বন্ধ।

মহরার দায়িত্বে থাকা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য অর্থ জমা দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও জায়গার অভাবে হাজার হাজার আবেদন জমে আছে। সাধারণত একটি মরদেহ প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত কবরে রাখা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই কবর পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।’

কবর খনন ও দাফন-সংশ্লিষ্ট কর্মীরা জানান, টেন্ডারের মাধ্যমে বরাদ্দ হওয়া অর্থের পুরোটা তারা পান না। ফলে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের দেয়া অর্থের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয় তাদের। আজিমপুরে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ জন কর্মী দুই শিফটে কাজ করেন। এখানে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত সাধারণ কবরের নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বড়, মাঝারি ও ছোট কবরের জন্য যদিও যথাক্রমে ১ হাজার ১০৫, ৭১৬ ও ৪৪৮ টাকা ফি আদায় করে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে কবরস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জমি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত শহরগুলোয় জনসংখ্যার অনুপাতে কবরস্থানের জমি নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। কোথাও সবুজ কবরস্থান, কোথাও বহুতল সমাধির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। অথচ ঢাকায় কত মানুষের জন্য কত আয়তনের কবরস্থান প্রয়োজন—এ নিয়ে এখনো কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, ঢাকায় কবরস্থানের সংকট এখনো ততটা তীব্র হয়ে ওঠেনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় কী পরিমাণ কবরস্থান প্রয়োজন, সে আলোচনাটা এখনো জোরালো হয়নি। এর কারণ নগরের বেশির ভাগ বাসিন্দা তাদের নিজ গ্রামে স্বজনকে কবর দিতে চায়। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকায় কবরস্থ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে। ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে আসা মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে ঢাকায় কবর দেয়ার প্রবণতা আরো বাড়বে। তাই এখনই রাজধানীতে কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন।’

তিনি জানান, বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য একটি এক একরের কবরস্থান প্রয়োজন। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি হলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থান। আর বেসরকারি হিসাবে জনসংখ্যা ২ কোটি ধরলেও প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০০ একর জমি। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থান নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়