শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬
spot_img
Homeসংবাদজাতীয়কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুই ইউনিট সংস্কারে অর্থ দিতে আগ্রহী জাইকা

কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুই ইউনিট সংস্কারে অর্থ দিতে আগ্রহী জাইকা

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঝুঁকিপূর্ণ দুটি ইউনিট সংস্কারকাজে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সাত বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পটি স্থগিত ছিল।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘসূত্রতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রটির পরিচালন নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাইকার সহায়তায় ইউনিট ৪ ও ৫-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে জাইকার একাধিক প্রতিনিধি দল কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান বলেন, “দুটি ইউনিটেরই পূর্ণাঙ্গ ওভারহল বা সংস্কার প্রয়োজন।”

কেন্দ্রের নথি অনুযায়ী, ইউনিট দুটির নির্ধারিত সংস্কার ও মেরামতকাজের সময়সীমা বহু আগেই শেষ হয়েছে। ইউনিট ৪ সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ২০১০ সালের জুনে এবং ইউনিট ৫ করা হয় ২০১১ সালের এপ্রিলে। কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত ১০ বছর পরিচালনার পর প্রতিটি ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রয়োজন হয়।

যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বর্তমানে ইউনিট দুটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সেগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২০ মেগাওয়াট কমে গেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা।

নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই চলছে ইউনিট দুটি

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, ইউনিট দুটির জেনারেটর ধারণকারী ধাতব কাঠামোয় ফাটল দেখা দেওয়ায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে সেগুলো চালু রাখতে হচ্ছে।

কাঠামোগুলো প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজন হলে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাঝেমধ্যে ইউনিট দুটি বন্ধও রাখতে হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এর আগেও বড় ধরনের যান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই কর্মকর্তা জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠান তোশিবার একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ইউনিট দুটি পরিদর্শন করে। তারা বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া ইউনিট দুটি চালু রাখলে পরিচালন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিল।

তবে বিদ্যুতের চাহিদার কারণে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও অস্থায়ীভাবে মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি চালু রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

সাত বছরের টেন্ডার জটিলতায় আটকে প্রকল্প

কর্মকর্তাদের মতে, ইউনিট দুটি সংস্কারের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। সে সময় তোশিবা ইউনিট দুটির কারিগরি মূল্যায়ন করে।

পরে ২০১৯ সালে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রতিযোগিতা না থাকায় তা বাতিল করা হয়।

এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর, ২০২১ সালের মে এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) তিন দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়।

তবে কর্মকর্তারা জানান, ইউনিটগুলো তোশিবার প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় বাংলাদেশে তোশিবার প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি দরপত্রের শর্ত পূরণ করতে পারেনি। স্থানীয় ঠিকাদারদের আপত্তির মুখে এসব দরপত্র প্রক্রিয়াও বাতিল হয়ে যায়। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে।

কৌশলগত গুরুত্ব

বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলীরা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নের অংশ হিসেবেই জাইকা এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। কারণ কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রই দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

তাদের মতে, এ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত কম। জ্বালানি খরচ না থাকায় কখনও কখনও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় এক টাকারও নিচে নেমে আসে।

কর্মকর্তারা জানান, নতুন প্রকল্প প্রস্তাবে শুধু জেনারেটর নয়, ইউনিট দুটির টারবাইন অংশও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০১৮ সালে প্রকল্প ব্যয় ১০০ কোটি টাকার বেশি ধরা হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বিপিডিবির প্রকল্প পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ডেইজি পারভীন টিবিএসকে বলেন, “মিশন বৈঠকে ইউনিট দুটি সংস্কারে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে জাইকা। আমাদের একটি দল ইতোমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেছে। কী ধরনের কাজ প্রয়োজন, তা উল্লেখ করে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।”

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ১৯৬২ সালে উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়