প্রাইম ভিশন ডেস্ক
প্রতিবেশী দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ, সীমান্ত ও বাণিজ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক অনেকটা রেওয়াজের মতো। এসব বৈঠকের কোনোটি হতো ঢাকায়, আবার কোনোটি হতো দিল্লিতে। বিএনপি সরকার গঠনের পর ঢাকায় হয়নি দুই দেশের মধ্যে কোনো বৈঠক। অবশ্য সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকায় হতে যাচ্ছে দুই দেশের আন্তঃসরকারের বৈঠক। আর তাতে প্রধান বিষয় থাকছে রেলওয়ে।
আগামী ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ‘ইন্টার-গভর্মেন্টাল রেলওয়ে মিটিং’ (আইজিআরএম) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। গত ২৪ জুন এ বৈঠকের বিষয়ে ভারত চিঠি লেখে। তাতে ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর বৈঠকের জন্য প্রস্তাব করা হয়। বাংলাদেশ গত ২ জুলাই পাল্টা চিঠি দিয়ে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর বৈঠকের প্রস্তাব করে। শেষ পর্যন্ত ‘হোস্ট কান্ট্রি’ হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছে বাংলাদেশের প্রস্তাব করা তারিখই।
কোনো ইস্যুতেই চলতি জুলাই ও আগামী আগস্টে দুই দেশের মধ্যে কোনো বৈঠকের সূচি চূড়ান্ত হয়নি। এ সময়ের মধ্যে আর কোনো বৈঠক না হলে এটিই আন্তঃসরকার পর্যায়ে ঢাকায় দিল্লির প্রথম সফর হবে।
গত জুনে নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও সেটি দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়মিত বৈঠক ছিল। সে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের। এবার রেল ইস্যুতে বৈঠকে অংশ নিতে ভারতীয় রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি প্রতিনিধিদল।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট বিরতিতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি), স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ‘হোম সেক্রেটারি লেভেল টকস’, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক, যৌথ বাণিজ্য কমিটির (জেটিসি) বৈঠক এবং নৌপথ ও প্রটোকল রুট নিয়ে ‘পিআইডব্লিউটিটি স্ট্যান্ডিং’ কমিটির বৈঠক হয়।
সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আইজিআরএমকে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ আবার সক্রিয় হওয়ার প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এটি ৩৮তম আইজিআরএম। বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। এখন কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার পালা। এর আগে ২০২৫ সালের ২০-২২ জানুয়ারি নয়াদিল্লির রেলভবনে অনুষ্ঠিত হয় আইজিআরএম ৩৭তম বৈঠক। সে ধারাবাহিকতায় এবার আয়োজক ঢাকা। আইজিআরএমের আগে যদি দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু না হয়, তাহলে এতেই বেশি জোর দেওয়া হবে। ট্রেন চালাতে যে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করে আলোচ্যসূচি ঠিক করেছে। মৈত্রী এক্সপ্রেস, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করার বিষয়ে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র বহনের জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে প্রস্তাব দেওয়া হবে। রাজশাহী-কলকাতার মধ্যে ট্রেন চালাতে চায় বাংলাদেশ। নতুন এই রুট নিয়েও হবে আলোচনা। মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচলের পথ বদল করতে চায় বাংলাদেশ। যমুনা সেতু হয়ে মৈত্রী ট্রেন চলাচল করে। পদ্মা সেতুকে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকার। বৈঠকে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ প্রস্তাবে উল্লেখ করা হবে রাতের বেলা ট্রেন পরিচালনার বিষয়টিও।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী কী বিষয় তোলা হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলছিলেন, ‘আমাদের দিক থেকে আলোচনায় তোলার মতো অনেক কিছুর প্রস্তুতি নেওয়া আছে। যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলা হবে। বেশ কিছু দেনা-পাওনার কথা রয়েছে। সেগুলো নিয়েও আলাপ হবে।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র বলছে, আটটি আন্তঃদেশীয় রেল ইন্টারচেঞ্জের মধ্যে বর্তমানে অচল সংযোগগুলো পর্যায়ক্রমে সচল করার উদ্যোগ; মালবাহী ট্রেন পরিচালনা আরও সহজ করা এবং সীমান্ত স্টেশনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর আলোচনা বৈঠকে তোলা হবে। এ ছাড়া আন্তঃদেশীয় রেল অবকাঠামো, চলমান যৌথ প্রকল্পের অগ্রগতি, সীমান্ত রেলসংযোগ এবং কারিগরি সহযোগিতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মোট আটটি রেল ইন্টারচেঞ্জ থাকলেও সচল রয়েছে পাঁচটি। স্বাধীনতার আগে নির্মিত ঐতিহাসিক রেলপথগুলোর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচলের সুবিধার্থে নতুন সংযোগও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনে। পণ্যবাহী ট্রেন চললেও যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকায় দুই দেশের মানুষের সরাসরি রেল যোগাযোগ কার্যত স্থবির হয়ে আছে।


