প্রাইম ভিশন ডেস্ক
সিডিএর তথ্যমতে, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় দৈনিক মোট যাতায়াত (ট্রিপ) ছিল ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার। ২০৩০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৯২ লাখ ৮৮ হাজারে, ২০৪০ সালে ১ কোটি ২২ লাখে এবং ২০৫০ সালে ১ কোটি ৫৬ লাখে পৌঁছানোর হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০৫০ সালে দৈনিক যাতায়াত প্রায় ৮২ লাখ বাড়তে পারে।
বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে প্রায় ১ হাজার ১০০ বাস চলাচল করছে। তবে রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ও আধুনিক বাস বহর চালুর মাধ্যমে প্রায় ৭০০ বাস দিয়েই ভবিষ্যতের গণপরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয় পরিকল্পনায়।
এতে বাস, টার্মিনাল, ডিপো, বাস বে ও স্টপেজের জন্য ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সামগ্রিকভাবে বাস, ট্রাফিক ও পার্কিং ব্যবস্থা আধুনিকায়নে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
২০২২ সালে মোট যাতায়াতের ২১ শতাংশ হয়েছে গণপরিবহনে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই হিস্যা ২০৩০ সালে ২৪ শতাংশ, ২০৪০ সালে ২৬ শতাংশ ও ২০৫০ সালে ২৮ শতাংশে উন্নীত হবে।
পরিবহন অবকাঠামোতে ৫,০০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা
পরিকল্পনায় যানজটের কারণ হিসেবে শুধু সড়কের স্বল্পতাকে দায়ী করা হয়নি। অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র বাস থামানো, দুর্বল মোড় ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখল, সড়কে পণ্যবাহী যান রাখা ও ট্রাফিক আইন না মানাকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় ৬৮টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন ও পার্কিং ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার জন্য বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এর জন্য প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এছাড়া মোট ৩৮৫.৫৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪.৯৭ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন এবং ১৪০.৬ কিলোমিটারনতুন সড়ক নির্মাণ করা হবে।
পরিকল্পনায় হালিশহর সড়ক, পাহাড়তলী কলেজ রোড ও বায়েজিদ বোস্তামী সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলা ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের সঙ্গে নতুন সড়ক সংযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
মেট্রোরেলের আগে বাস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেল কার্যকর করতে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে প্রায় ১৮ হাজার যাত্রীর চাহিদা প্রয়োজন। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও ২০৪০-২০৫০ সালের আগে চট্টগ্রামে এই মাত্রার যাত্রী চাহিদা তৈরি করা কঠিন। কিছু পরিস্থিতিতে ২০৮০ সালের মধ্যেও প্রয়োজনীয় চাহিদা তৈরি না-ও হতে পারে।
এ কারণে পরিকল্পনায় তাৎক্ষণিকভাবে মেট্রোরেলে বড় বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান বাসব্যবস্থাকে পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান খণ্ডিত বাসব্যবস্থাকে এক বা একাধিক কোম্পানির অধীনে আনার প্রস্তাবও রয়েছে। কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনার মাধ্যমে রুট পুনর্বিন্যাস, নির্ধারিত সময়সূচি, আধুনিক টিকিট ব্যবস্থা, বেতনভুক্ত চালক ও পারফরম্যান্সভিত্তিক পরিচালনা চালুর কথা বলা হয়েছে।
ছয় উপজেলায় নতুন বাস টার্মিনাল
শহরের ওপর আন্তঃজেলা ও আঞ্চলিক বাসের চাপ কমাতে আনোয়ারা, পটিয়া, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী, সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ও রাউজানে নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
হাটহাজারীর বিদ্যমান টার্মিনাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহর ও আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোর উন্নয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে এ পরিকল্পনায়।
কমিউটার ট্রেন ও ওয়াটার বাস
চট্টগ্রামের বিদ্যমান রেল অবকাঠামো ব্যবহার করে কমিউটার রেলসেবা সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে পরিকল্পনায়। শহরের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও পটিয়ার সরাসরি কমিউটা রট্রেন চালুর কথা বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে কর্ণফুলী নদীকে গণপরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাটের মধ্যে ওয়াটার বাস চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক রিভার ক্রুজ চালুর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এজন্য ওয়াটার বাস সেবা চালুর আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
১০ হাজার পণ্যবাহী যানের জন্য টার্মিনাল
বন্দরকেন্দ্রিক পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমাতে অন্তত ১০ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার একাধিক আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে।
এর মধ্যে সলিমপুরে ২ হাজার এবং ভাটিয়ারী, আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে ১ হাজার করে ট্রাক ধারণক্ষমতার টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বে টার্মিনাল এলাকায় ৫ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার টার্মিনাল আলাদাভাবে নির্মাণ করছে।
সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এবং চট্টগ্রাম মহানগর মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের পরিচালক মো. আবু ঈসা আনছারী টিবিএসকে বলেন, চট্টগ্রামের পরিবহন সমস্যা শুধু সড়ক প্রশস্ত করে সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের যাতায়াতের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে গণপরিবহনকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।’
এ পরিকল্পনায় বাসের রুটগুলোকে পুনর্বিন্যাস ও আধুনিকায়ন, অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত বিদ্যমান রেললাইনগুলোতে কমিউটার ট্রেন চালু এবং নৌপথকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।


