বুধবার, মে ১৩, ২০২৬
spot_img
Homeচট্টগ্রামঅশান্ত রাউজান, বাড়ছে খুন, আবার যুবদল কর্মীকে মাথায় গুলি করে হত্যা

অশান্ত রাউজান, বাড়ছে খুন, আবার যুবদল কর্মীকে মাথায় গুলি করে হত্যা

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

চট্টগ্রামের রাউজানে চারদিনের ব্যবধানে মো. ইব্রাহিম (২৮) নামে আরও একজন যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার  দুপুর ১টার দিকে রাউজান সদর ইউপির পূর্ব রাউজান ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গাজীপাড়ায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত ইব্রাহিমের পিতার নাম মোহাম্মদ আলম বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিক্সায় করে আসা একদল দুর্বৃত্ত ইব্রাহিমকে মাথায় গুলি করে দ্রুত চলে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এ ঘটনা ঘটেছে।

এর আগে গত শনিবার রাতে রাউজানের বাগোয়ান গরীর উল্লাহ পাড়ায় খুন হন আরেক যুবদলকর্মী আবদুুল্লাহ মানিক।

অশান্ত রাউজান, চারপাশে আতঙ্ক

চারটি মোটরসাইকেলকে ধাওয়া করছে আরও চারটি মোটরসাইকেল। পেছন থেকে ছোড়া হচ্ছে গুলি। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, রাউজানের বর্তমান নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খণ্ডচিত্র।

এক সময় ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাউজানে মানুষের আশা ছিল ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর এলাকায় শান্তি আসবে, আওয়ামী লীগের এমপি এবিএম ফজলে করিমের ‘পতনের পর’ বন্ধ হবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও খুনের রাজনীতি।

কিন্তু বিএনপির দ্বিধা-বিভক্ত রাজনীতির কারণে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা। গ্রুপিং, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটছে একের পর এক হত্যার ঘটনা।

গত ২৮ আগস্ট থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত ৭ মাসে ৭ জন খুন হয়েছেন রাউজানে। এর মধ্যে পৌরসভায় দু’জন, নোয়াপাড়া ইউনিয়নে দু’জন, চিকদাইর ইউনিয়নে একজন, হলদিয়া ইউনিয়নে একজন ও পূর্বগুজরা ইউনিয়নে একজন খুন হয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের রাজনীতির বিভেদ রাউজানকে রক্তাক্ত করেছে। দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হামলা-মামলার ঘটনা ঘটছে।

আবার একই গ্রুপের নেতাদের মধ্যেও হচ্ছে সংঘাত। ৫ আগস্টের পর বিএনপির দুই গ্রুপে শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীসহ অন্তত তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

৫ আগস্ট পরবর্তী কিছু বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও মারামারি ঘটনা ঘটলেও হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ২৮ আগস্ট। ওইদিন বিকেলে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিকলীগ নেতা আব্দুল মান্নানকে (২৭)।

তিনি বেতবুনিয়া সুগারমিল ডাকবাংলো এলাকার কবির আহাম্মদের ছেলে। এরপর ১ সেপ্টেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে মো. ইউসুফ মিয়া (৬৫) নামে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত ইউসুফ রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল শুক্কুর মিয়ার বাড়ির প্রয়াত শামসু মিয়ার ছেলে। লাশ উদ্ধারের আগের দিন নিখোঁজ হন তিনি। স্থানীয়দের ধারণা, সাবেক এমপির বাগানবাড়িতে শ্রমিকের কাজ করায় তাকে হত্যা করা হতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত তার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া। সে কারণে হত্যার কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ১১ নভেম্বর নিখোঁজের তিন দিনের মাথায় রক্তাক্ত অবস্থায় হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (৪৮) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

১১ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টায় উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়নের কালাচাঁন চৌধুরী সেতুর পাশে সর্তাখাল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি রাউজান উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আকবর শাহ (রহ.) বাড়ির প্রয়াত আবদুল মান্নানের ছেলে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় তাহেরের মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

২৪ জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেল যোগে জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাওয়ার পথে দিনদুপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫০) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। চাঁদা না দেওয়ায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত জাহাঙ্গীর আলম উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিরামিশপাড়ার আবু ছৈয়দ মেম্বারের বড় ছেলে। জাহাঙ্গীর চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জের পাইকারি শুঁটকি ব্যবসায়ী।

১৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান (৩৫) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে একদল মুখোশধারী দুর্বৃত্ত। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরীহাট বাজারের কাছে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত হাসান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আহমেদ হোসেন মেম্বার বাড়ির মো. বজল আহমেদ ড্রাইভারের ছেলে।

গত ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের পিটুনি ও ছুরিকাঘাতে কমর উদ্দিন জিতু (৩৬) নামে এক যুবদলকর্মী নিহত হন। ওই দিন রাতে উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নে আমির চৌধুরী হাটে তাকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। নিহত কমর উদ্দিন জিতু হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্ত্তা গ্রামের মুহাম্মদ আলীর ছেলে।

সর্বশেষ ২১ মার্চ উপজেলার পূর্বগুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বৃহত্তর হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশে খোলা জমি থেকে মো. রুবেল (৩৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গরু চোর সন্দেহে তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত রুবেল চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার প্রয়াত নুরুল আলমের ছেলে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূইঁয়া বলেন, ‘এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দিনরাতে কাজ করছে। রাউজানকে শান্ত রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যারা অপরাধ তৎপরতা চালাচ্ছে বা অপরাধ কর্মকাণ্ড করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়