প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থানীয়ভাবে এখনো ‘আমেরিকান হাসপাতাল’ নামে পরিচিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের চর্ম ও যৌনরোগ চিকিৎসার একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এ হাসপাতালটি। ৭০ বছরের পুরনো হাসপাতালটির অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, মানহীন অবকাঠামো, ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসক সংকট এবং আধুনিকায়নের অভাবে প্রতিদিন শত শত রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একটি চর্ম ও যৌন চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণ করতে হলে অন্তত ৩৯টি বিভাগ প্রয়োজন। এ রোগের অন্তত সাড়ে তিন হাজারের বেশি ধরন আছে। অথচ বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে মাত্র একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং চারজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫৫০-৬০০ রোগীর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যৌন সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন পড়ে। সেখানে হাসপাতালটিতে সেক্সোলজিস্ট বা সাইকোথেরাপিস্ট পদে কোনো বিশেষজ্ঞ না থাকায় রোগীরা এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতালটিতে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অফিসার, ব্যাকট্রোলজিস্ট, নার্স, ফার্মাসিস্টসহ প্রায় ৩৫ জনের পদক্রম সৃষ্টি করা হয় অন্তত তিন দশক আগে। এরপরে আর নতুন পদ সৃজন না করায় পুরনো অর্গানোগ্রাম দিয়েই চলছে বিশেষায়িত এ হাসপাতাল। এসব পদের মধ্যে বেশ কয়েকটি পদ শূন্য আছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর লোকবলের সংকটে হাসপাতালটি শতভাগ চিকিৎসসেবা দিতে পারছে না।
হাসপাতালটিতে স্ক্যাবিস, সোরিওসিস, দাউদ, একজিমা, কুষ্ঠ, শ্বেতীরোগ, ব্রণ, যক্ষ্মা, সিফিলিস, গনোরিয়া, আইজিআরএ, সিমার প্যাথলজি, এএনই, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, আর্টিকোরিয়া, সাইকোসেক্সুয়াল ডিজঅর্ডারসহ বিভিন্ন চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। অথচ ল্যাব টেকনিশিয়ান আছেন মাত্র একজন। ফলে সব রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। হাসপাতালটিতে কিছু বায়োকেমিক্যাল, এএসএফ, রক্ত পরীক্ষার মতো কিছু টেস্ট করানো হলেও বায়োপসি (হিস্টোপ্যাথলজি), লিভার টেস্টের জন্য বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
হাসপাতালটিতে ১২ ধরনের ট্যাবলেট, আট ধরনের ক্যাপসুল, আট ধরনের সিরাপ ও অন্য আরো অনেক ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু রোগীদের চাপ অত্যধিক হওয়ায় সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ সব রোগীকে দেয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে রোগীদের চাপ বেশি হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে সোরিওসিস ক্লিনিক ও আর্টিকোরিয়া ক্লিনিক চালু করেছে। আর্টিকোরিয়া ক্লিনিকে (ছুলি বা হিবস) প্রতি মাসের শেষ সোমবার চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। আর সোরিওসিস রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করায় এ রোগের জন্য আলাদা কর্নার খোলা হয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর সম্পূর্ণ মেডিকেল হিস্ট্রির রেকর্ড রাখা হয়।
সরজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভোর ৬টা থেকেই হাসপাতালে ভিড় করে চট্টগ্রাম ও আশপাশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ। মাত্র ৫ টাকা মূল্যের টিকিট সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেয়া হয় বহির্বিভাগে (শুক্রবার বন্ধ)। হাসপাতালে ইনডোর চিকিৎসাসেবা না থাকায় রোগী ভর্তির সুযোগ নেই। হাসপাতালের ভবনটিও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভেতরের বেশকিছু জায়গায় প্লাস্টার ভেঙে গেছে। বাথরুমের অবস্থা শোচনীয়। হাসপাতালের বাইরের খালি জায়গার বেশির ভাগই নোংরা ও আবর্জনায় ভরা। দুপুরের পর হাসপাতালের ভেতরে মাদক ও জুয়ার আসর বসে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় চুরির ঘটনাও ঘটেছে হাসপাতালটিতে।
কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান রাহাত বলেন, ‘দিনদিন রোগের ধরন পাল্টাছে, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আধুনিকায়ন হয়েছে কিন্তু হাসপাতালের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুরনো ভবনেই হাসপাতালটি পরিচালনা করা হচ্ছে। ল্যাবের সেবাও সীমিত। আধুনিক চিকিৎসাসেবা দিতে হলে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেকেই মানসম্মত সেবা পান না। এখানে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি হাসপাতালমুখী হচ্ছেন রোগীরা।’


