প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পা। চট্টলবীর খ্যাত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অতি আদরের মেয়ে। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী টুম্পা শুধু মেধাবী ছাত্রীই নয়, বিতর্ক, আবৃত্তি, অভিনয় ও উপস্থাপনায় অনন্য ছিলেন।
জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি শুদ্ধ সংস্কৃতি ও ধ্রুপদী সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত হয়েছিলেন টুম্পা। তার নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। সহমর্মিতা ও মানবিক গুণে ভালো কাজের জন্য একসঙ্গে চলার মানসিকতায় সকলকে কাছে টানতেন তিনি।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী টুম্পা ২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারেননি রাজনীতিবিদ বাবা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তিনি জেলে থাকা অবস্থাতেই তাঁর মেয়ে ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পার ক্যান্সার ধরা পড়ে।
ব্যাংককে চিকিৎসাধীন মেয়েকে দেখতে পরিবার প্যারলে মুক্তি চাইলে মহিউদ্দিনকে ‘রাজনীতি ছাড়ার’ শর্ত দেওয়া হয়। মেয়েকে মৃত্যুশয্যায় দেখতে না পেলেও সেই শর্ত মানেননি চট্টলবীর।
২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর মহিউদ্দিন জামিনে মুক্ত হলেও ব্যাংককে যেতে সরকার তালবাহানা করে যাত্রা বিলম্বিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ব্যাংককে পৌঁছার আগেই ১৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বসে তিনি টুম্পার মৃত্যু সংবাদ পান। টুম্পার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে না পারার এই দুঃখের কথা আমৃত্যু বলতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
প্রায় এক যুগ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেওয়া এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সেই অতি আদরের মেয়ে ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
এক-এগারোর সময় মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকাকালীন মেয়ে ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পা বাবার কাছে লিখেছিলেন একটি চিঠি। ২০১৯ সালে টুম্পার ১১ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার লেখা সেই চিঠি ফেসবুকে তুলে ধরেন তার ভাই শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
‘প্রিয় বাবা, তোমার শূন্যতা খুব বেশি অনুভব করছি। সকালে জেগে ওঠার জন্য এখন আর কেউ বকাবকি করে না। বাড়ির যে গাছগুলোতে রোজ পানি ছিটিয়ে সজীব করে রাখতে তুমি, তারাও এখন খুব বিষণ্ন, নির্জীব। ট্রাফিক সিগনালে লালবাতি জ্বলে উঠলে যে ভিখারীটি গাড়ির কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেও তোমার বেশ অভাববোধ করছে। আমি, আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায় দিন গুনছি। বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি ফিরে এসো বাবা। একবার আমি তোমাকে ড্যাড বলে ডাকতে চাই-ফৌজিয়া সুলতানা টুম্পা’।
এদিকে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে সাংবাদিক মোয়াজ্জেমুল হক ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, মৃত্যুর আগে জননেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তাঁর মেয়ে টুম্পা লিখেছিলেন,
“আমি কখনো তোমাকে বলতে পারিনি, তুমি আমার কাছে কী! তোমার কাছে কোনো দিন মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারিনি। শুধু এটুকু বলতে পারি, যখন এ চিঠি লিখছি, আমার চোখ ছাপিয়ে পানি নামছে। আমি তো কখনো তোমাকে বলতে পারিনি তুমি শ্রেষ্ঠ বাবা, তুমি আমার আদর্শ।
আব্বু, তোমাকে কি একটা প্রশ্ন করতে পারি? তুমি তো আল্লাহকে বিশ্বাস করো। একজন ভালো মানুষের সব গুণ তোমার মধ্যে আছে। তোমার ঈশ্বর কি সেটা দেখছেন না? তিনি কি দেখছেন না তুমি কী কষ্ট পাচ্ছ? এত কিছুর পর আমি কি আল্লাহর ওপর আস্থা রাখব? কিন্তু আমি রাখছি।
সেই সকালবেলাগুলো আজ খুব মিস করছি, যখন তুমি খুব ভোরবেলা উঠে ছড়া আবৃত্তি করতে…। আব্বু, তোমাকে আজ হাজারবার ডাকতে ইচ্ছা করছে… চিৎকার করে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছা করছে।
…লবণাক্ত অশ্রুর বিন্দু ছাড়া আমি আর তোমাকে কী দিতে পারি? যে কাগজটাতে লিখছি, সেটা আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। আমার চোখের পানিতে কাগজটা ভিজে যাচ্ছে।
তুমি আমার হৃদয়ের সবচেয়ে গভীরতম স্থানটিতে আছ, চিরকাল সেখানেই তুমি থাকবে।
—তোমার টুম্পা।”


