প্রাইম ভিশন ডেস্ক
একটি সাধারণ ভাড়া বাসা। বাইরে থেকে দেখলে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। ৫ আগস্ট সেখানে মাসে চার হাজার টাকায় একটি ঘর ভাড়া নেন আব্বাস আলী নামের এক ব্যক্তি। বাড়িওয়ালাকে জানান, তিনি প্রাইভেট কার চালান। পাশের স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করাবেন, এই কারণেই নাকি বাসাটি পছন্দ হয়েছে।
কিন্তু দিনের আলো ফোটার পর সেই ভাড়াটিয়াকে আর প্রায় দেখাই যায়নি। রাতের আঁধারে আসত কিছু জিনিস। নিচতলা থেকে মাঝেমধ্যে ভেসে আসত ভারী কিছু রাখার শব্দ।
কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল ভয়ংকর এক চিত্র—মিলল পাইপ বোমা, হাতবোমা ও বোমা তৈরির নানা উপকরণ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হেমায়েতপুরের শ্যামপুরের ওই বাসা ঘিরে অভিযান শুরু করে পুলিশ। রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত চলে অভিযান। প্রথমে উদ্ধার হয় ৫টি, পরে আরও ৮টিসহ উদ্ধার করা হয় মোট ১৩টি পাইপ বোমা।
সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের, তা হলো, বোমাগুলোর গঠন। বাসাবাড়ির পানির লাইনে ব্যবহৃত সাধারণ পাইপ দিয়েই তৈরি করা হয়েছে এসব বোমা।
তবে এই পুরো চক্রটির প্রধান কারিগর নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ এখনও পলাতক রয়েছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায়, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে উদ্ধারকৃত ছাতাবোমাও এই একই চক্র তৈরি করেছে।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধঘোষিত নব্য জেএমবির শীর্ষ স্তরের প্রশিক্ষক বোমারু মামুন ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনাকারী ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে কারামুক্ত হয়ে সে আবারও আরিফসহ ১৫-২০ জনের একটি গোপন সেল গঠন করে দেশে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই বিষয়ে আজ দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত কথা চলবেন সিটিটিস প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক।
আশুলিয়ার প্রেশার কুকার, সূত্র কি এই বাসায়?
তদন্তকারীদের দাবি, সাভারের এই বাসা আর সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে যোগসূত্রের ইঙ্গিত মিলেছে।
আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া প্রেশার কুকার বোমাটি এই হেমায়েতপুরের বাসাতেই তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। ওই বোমার সূত্র ধরেই গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
শুধু আশুলিয়া নয়, মতিঝিলের মেট্রোরেল স্টেশন এলাকায় উদ্ধার হওয়া পাইপ বোমার সঙ্গেও সাভার থেকে উদ্ধার করা বোমার গঠনে মিল পেয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
অর্থাৎ প্রশ্নটা এখন শুধু ১৩টি বোমা উদ্ধারের নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একই ধরনের বোমা কি একই নেটওয়ার্কের হাতে তৈরি হচ্ছে?
সাভারের এই অভিযানে তদন্তকারীরা পেয়েছেন টিএটিপি—ট্রাই অ্যাসিটোন ট্রাই পারঅক্সাইড। গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনায়ও একই ধরনের বিস্ফোরক উপকরণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল সিটিটিসি।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেরানীগঞ্জ ও সাভারের ঘটনার ধরন এবং উদ্ধার হওয়া উপকরণ দেখে দুটির মধ্যে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এখানেই তদন্তের পরিধি আরও বড় হয়ে যায়।
কেরানীগঞ্জের সেই ঘটনায় আগে থেকেই আলোচনায় এসেছিল মোহাম্মদ আরিফের নাম। পরে একাধিক ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এক নাম, একাধিক ঘটনার ছায়া
২৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের উম্মুল কুরা মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটে। গ্রেপ্তার হন মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিন।
এর আগে নব্য জেএমবির সদস্য সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আল আমিনের সহযোগী হিসেবে তখনই মোহাম্মদ আরিফের নামের আভাস পাওয়া যায় বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
এরপর ফেব্রুয়ারিতে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশির সময় ছুরিকাঘাত করে বোমার ব্যাগ ফেলে পালানোর ঘটনা। মার্চে কুমিল্লার শিব মন্দিরে বিস্ফোরণ। একই মাসে সায়দাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণ। এসব ঘটনায় আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তবে এতদিন তার বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ্যে আনেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে গ্রেপ্তারের খবর চেপে রেখেই চলছিলো অভিযান। আরিফের তথ্য থেকেই ক্লু মেলে সাভারে তার তৈরি বোমা তৈরি ল্যাবের।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও অভিযান চলছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফ তার একজন ‘গুরু’র কথা বলেছেন। ওই ব্যক্তি পেশায় হোমিও চিকিৎসক বলে জানিয়েছে পুলিশ।


