প্রাইম ভিশন ডেস্ক
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোতে কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতার তুলনায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। সেখানে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির সারি। ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরাও।
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ মূলত এই দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ায় সরবরাহে ধাক্কা
পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টা পর্যন্ত মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ বর্তমানে টার্মিনাল দুটির সরবরাহ তাদের পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৩৭ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) প্রকৌশলী মোহা. মাহমুদুল হাসান টিবিএসকে বলেন, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের একটি বর্তমানে চালু রয়েছে। অন্যটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ আছে। মেরামতকাজ শেষ হলে দ্বিতীয় বয়লারও চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু এক্সিলারেটের কারিগরি সমস্যাই নয়, সামিটের টার্মিনালেও আবহাওয়াজনিত সমস্যা হচ্ছে। সেখানে একটি এলএনজি জাহাজ থাকলেও বাতাসের গতিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেটি নিরাপদে বার্থিং করতে পারছে না। ফলে জাহাজ থেকে এলএনজি আনলোডিং বা স্থানান্তরের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে অপারেশন শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে। তবে জাহাজের অপারেশন শুরুর বিষয়টি পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলএনজি সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ৪০%
মহেশখালীর সরবরাহ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৩৫০ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বুধবার সকালে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১০ এমএমসিএফডি।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১৪০ এমএমসিএফডি বা ৪০ শতাংশ।
কেজিডিসিএলের ইঞ্জিনিয়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী টিবিএসকে বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পরিবর্তিত সরবরাহের ভিত্তিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়, সেটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ ২৩০ থেকে ২৩৪ এমএমসিএফডির মধ্যে ছিল। তবে দুপুরের পর তা আবার কমতে শুরু করে। গত রাতে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় ঘাটতি তীব্র হয়েছে।
সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পে বুধবার সকাল ১১টায় গাড়িচালক আকতার হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পর আবার গতকাল থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে।
ফসিল পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. ফখরুদ্দীন ইসলাম শিমুল বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, সাধারণত পাম্পে গ্যাসের চাপের রিডিং ২২০ থাকলেও বর্তমানে তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।
গত সোমবার রাত থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু সময় গ্যাস পাওয়া গেলেও আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।
নগরীর ওয়াসার মোড় এলাকার এস এইচ খান সন্স সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলেও গ্যাস পাওয়ার আশায় অনেক গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সিএনজি চালক মোহাম্মদ শফিক বলেন, তিনি সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কখন গ্যাস দেওয়া হবে, তা জানেন না। গাড়ি বের করার কারণে তাকে দৈনিক ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে আয় না করেও ভাড়া দেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর টাইগারপাস এলাকার রেইনবো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। ফলে বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, গাড়ির জট এবং চালকদের আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপরও। হামজারবাগ এলাকার মোহাম্মদ আফজল ফরমান বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার সঙ্গে নতুন করে গ্যাসের সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। বাসায় ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে।
দৈনিক গ্যাস পরিস্থিতির বুলেটিন চান ব্যবসায়ীরা
এদিকে গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ সময়ের দৈনিক বুলেটিনের মতো গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একটি ‘দৈনিক গ্যাস পরিস্থিতি বুলেটিন’ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তার মতে, ওই বুলেটিনে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা, প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহ, মোট ঘাটতি, জাতীয় সরবরাহে এলএনজির অবদান এবং বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিক খাতে খাতভিত্তিক বরাদ্দের তথ্য থাকা উচিত।
পাশাপাশি কোন এলাকায় কত ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, গ্যাসের চাপ কত এবং সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে কী প্রভাব পড়ছে, সেসব তথ্যও প্রকাশ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
খন্দকার বেলায়েত হোসেন বলেন, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, এলএনজি আমদানির অগ্রগতি, অতিরিক্ত আমদানি সক্ষমতা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের তথ্যও নিয়মিত জানানো উচিত। এতে সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝার পাশাপাশি গুজব ও বিভ্রান্তি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি বাড়বে।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সেখানকার গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালুর মাধ্যমে আংশিকভাবে সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়। তবে দ্বিতীয় বয়লার এখনো মেরামতের আওতায় রয়েছে।
একই সময়ে সামিটের টার্মিনালে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি জাহাজ বার্থিং করতে না পারায় নতুন করে এলএনজি আনলোডিংও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে না পারায় এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।


