জেলে পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে জীবনযাপন না করে জেলে পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ও দক্ষতায় এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রামের কাটগড় এলাকায় জেলেদের নিয়ে আয়োজিত মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৬–এর সচেতনতামূলক সভায় এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক। সভায় জেলেদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, সেখানে সন্তানদের পাঠানোর দায়িত্ব অভিভাবকদেরও নিতে হবে।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা যদি আমাদের ভাগ্য, আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে চাই, একমাত্র যে মাধ্যম আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, সেটি হচ্ছে শিক্ষা।
জেলা প্রশাসক বলেন, দেশের অনেক জনগোষ্ঠীর জীবনমানে পরিবর্তন এলেও জেলে জনগোষ্ঠী এখনো কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারেনি। তাদের সন্তানদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। তাই জেলে পরিবারের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
জেলে পরিবারের শিশুদের জন্য স্বপ্নীল ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, স্কুলটিতে প্রয়োজনীয় বেঞ্চ, দরজা-জানালাসহ অন্যান্য উপকরণ দ্রুত সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর সেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত না গেলে উদ্যোগটি সফল হবে না।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্কুল দাঁড় করালাম, কিন্তু সেখানে আপনার সন্তানরা যদি না যায়, তাহলে কিন্তু হলো না। আপনাদের সন্তানদের পাঠাতে হবে।
এরপর নিয়মিত স্কুলে যাওয়া শিশুদের জন্য প্রণোদনার উদ্যোগের কথা জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, আপনাদের যাদের সন্তান স্কুলে পড়ালেখা করবে, তাদের জন্য আমরা ইনশাআল্লাহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরেকটি প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করব। তবে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনার সন্তানটি নিয়মিত স্কুলে যায়।
‘আপনার সন্তানও এভাবে কাজ করবে, এই চিন্তা সরাতে হবে’
মাছ ধরায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখ করে জেলে জনগোষ্ঠীকেও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর আহ্বান জানান মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেলে পরিবারের সন্তানেরা ভবিষ্যতে একই পেশায় থাকলেও যেন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও দক্ষ ও নিরাপদভাবে কাজ করতে পারেন, সেভাবে তাদের প্রস্তুত করতে হবে।
জেলেদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, আপনি যেভাবে আজকে কাজ করছেন, আপনার সন্তানটিও এভাবে কাজ করবে— এই চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। জেলেরা সাগরের কোথায় অবস্থান করছেন, পরিবারের সদস্যরা যেন তা জানতে পারেন, সে ধরনের প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জেলা প্রশাসক।
‘ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব সবার’
ইলিশকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী বা নৌ পুলিশের নয়, জেলেসহ সবাইকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের ইলিশকে নিয়ে অবশ্যই গর্ব করি। আমরা চাই না যে আমাদের ইলিশ কোনোভাবে হারিয়ে যাক।
মা ইলিশ সংরক্ষণে আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এই সময়ে জেলে পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। সরকার ও প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। জেলেদের সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাদের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ বা জাটকা ধরার তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, এ বিষয়ে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও নৌ পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। তবে শুধু অভিযান চালিয়ে ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এই সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। একা নেভি বা একা নৌ পুলিশের পক্ষে এটি সম্ভব নয়, যদি সবাই সচেতন না হয়।
জাটকা ধরার তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভের চেয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জাটকাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে জেলেরা বেশি লাভবান হবেন, পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও এর সুফল পাবে বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক।
বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্নতার ওপরও গুরুত্ব
জেলে পরিবারের স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, পরিবারের কোনো সদস্য রোগে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি গ্রহণের পাশাপাশি বসবাসের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
কোনো এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সমস্যা থাকলে মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি। সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
সবশেষে জেলে জনগোষ্ঠীর জীবনমানের পরিবর্তনে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগ, শিক্ষা ও পরিশ্রমের ওপর গুরুত্ব দেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আপনারা যদি আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পরিশ্রম করেন, আমরা অবশ্যই আপনাদের পাশে আছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিনে কোনো ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। এর জন্য শ্রম, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় লাগে।


