প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর একটি ছিল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। কিন্তু যে ছাত্রনেতারা সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন, জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতিতে তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে সীমিতসংখ্যক আসনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় এ শঙ্কা আরো ঘনীভূত হয়েছে। হংকংভিত্তিক প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে গতকাল প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনী সমঝোতা অনুযায়ী, ২৫৩ আসনের জোটে এনসিপিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩০টি আসনে। বিপরীতে জামায়াত পাবে ১৭৯টি আসন। বিশ্লেষকদের মতে, এ বণ্টন ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন শক্তি কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারবে তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এ প্রশ্নটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ, যখন ভোটারদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। একসময় যারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তাদেরই এখন ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে সামনে আনার দাবিতে ছাত্রনেতারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের দাবির কেন্দ্রে ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা, যা দেশজুড়ে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।
ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘তরুণ নেতাদের জন্য রাজনীতিতে আরো বড় পরিসর থাকা উচিত। আমি আশা করি, তারা গুরুত্ব হারাবে না।’ তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় যে আদর্শের কথা ছাত্রনেতারা বলেছিলেন, জামায়াতের মতো ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জোট সেই আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ তার ভাষায়, ‘জামায়াতের সঙ্গে যাওয়াটা মূলত এনসিপির একটি মরিয়া সিদ্ধান্ত।’
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত এনসিপির এখনো শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠন গড়ে ওঠেনি। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দলটি দৃশ্যমান ভূমিকা রাখলেও সাংগঠনিক ভিত্তির ঘাটতি স্পষ্ট। চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আহমদ এ জোটকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
শ্রীরাধা দত্তের মতে, এনসিপির জন্য এ সমঝোতা একটি কৌশলগত ভুল হতে পারে। তার ধারণা, ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তি ও রাজনৈতিক মধ্যপন্থার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জোট এনসিপির জন্য বেশি মানানসই হতো। এনসিপির ভেতর থেকেই অনেকে স্বীকার করেছেন, আসন বণ্টনের বাস্তবতায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জামায়াত বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি আসনের প্রস্তাব দেয়, যা কিছু নেতার কাছে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলটির অবস্থান আরো শক্ত করেছে। অপরদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে একঘরে থাকা জামায়াতের এ প্রত্যাবর্তন বিশ্লেষকদের কাছে নাটকীয় বলেই মনে হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জোট জামায়াতকে আবার রাজনৈতিক কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে তার মূল্য দিতে হতে পারে ছাত্রনেতাদের ভাবমূর্তিকে।
লন্ডনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, ‘এ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপ্লবটি ছাত্ররাই সংঘটিত করেছিল। কিন্তু এখন সেই আন্দোলন কার্যত প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে।’ তার মতে, ‘জোট জিতলেও সংসদে এনসিপির অল্পসংখ্যক আসন নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে দেবে না।’ সব মিলিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণ বলছে, যারা একসময় পরিবর্তনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন জোট-সমঝোতার হিসাব-নিকাশেই আটকে পড়ার ঝুঁকিতে।


