প্রাইম ভিশন ডেস্ক
স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রথমবার সামরিক অভ্যুত্থান দেখে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে সংঘটিত ওই অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।
এমন একসময় এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যখন দেশে রীতিমত অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।-বিবিসি বাংলা।
বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গঠন করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)। চারটি ছাড়া অন্যসব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিল করা হয়েছিল।
সেইসঙ্গে, দুর্নীতি-লুটপাট ও চুরি-ডাকাতির ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
এর মধ্যেই দল নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের ‘বিনা বিচারে হত্যা ও গ্রেপ্তারের’ প্রতিবাদে সরকারের বিরুদ্ধে নানান তৎপরতা শুরু করে চরমপন্থী বিভিন্ন সংগঠন।
আগাস্টের আগে শেখ মুজিবের ওপর এক দফা হামলাও হয়েছিল বলে তখন ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিল ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।
‘সব মিলিয়ে দেশে তখন দম বন্ধ হওয়ার মতো এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বাকশালের কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের সুযোগ যেহেতু সেভাবে ছিল না, সেজন্যই হয়তো সেনাবাহিনীর একটি অংশ তখন ক্যু করার পথ বেছে নিয়েছিল,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
কিন্তু শেখ মুজিব নিহত হওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশে ঠিক কী ঘটছিল?
শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ
শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ
দুর্নীতি ও লুটপাট
স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোনোভাবেই সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না শেখ মুজিবের সরকার।
১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পর দুর্নীতি ও লুটপাট আরও বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও সেসময়ের পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা যায়।
‘রিলিফের মাল দুঃস্থ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। চলে গম চুরি, চাল চুরি, কম্বল চুরি,’ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন।
দুর্নীতি, লুটপাট ও চোরাচালান বন্ধসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায় সরকার। তারা কাজ করতে গিয়ে দেখেন দুর্নীতি ও চোরাচালানের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই জড়িত।
‘তরুণ অফিসাররা এ সময় ক্ষমতাসীন পার্টির বেশকিছু প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পার্টির নেতারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেখ সাহেবের কাছে ক্রমাগত অভিযোগ তুলতে থাকে,’ নিজের বইতে লিখেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ।
দলের ভেতর থেকে চাপ বাড়তে থাকার একপর্যায়ে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনে সরকার।
‘এমন সিদ্ধান্তের ফলে সেনা সদস্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা নেগেটিভ পারসেপশন (নেতিবাচক ধারণা) তৈরি হয় যে, শেখ মুজিব তার দলের নেতাকর্মীদের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ না করে উল্টো প্রশ্রয় দিচ্ছেন,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
ফলে দুর্নীতি-লুটপাট আরও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। সেসময় সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে কীভাবে খাদ্যশস্য লুটপাট হচ্ছিল, ১৯৭৫ সালের ২৬ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে সেটির কিছু ছবি ছাপানো হয়।
ব্যাপারটিকে ‘হরির লুট’ আখ্যা দিয়ে খবরে লেখা হয়েছে, গুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচারের এমন ঘটনা অনেক দিন থেকেই ঘটছে।
এর কিছুদিন পর প্রকাশিত আরেকটি খবরে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, সরকারি গুদাম থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর সময় পথেই এক-চতুর্থাংশ খাদ্যশস্য ‘রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাচ্ছে’।
মূলত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে অনেকটাই ‘অরক্ষিতভাবে’ পাঠানোর কারণে যাত্রাপথে ট্রেনের বগি ভেঙে ‘ব্যাপকহারে খাদ্য পাচার’ করা হচ্ছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার একটি ছবিও প্রকাশ করে পত্রিকাটি।
১০ আগস্ট দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘সমাজের সর্বস্তর আজ দুর্নীতির বিষদাঁতে বিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের পরিবার-পরিজনকে দেওয়া ২৭১টি চেক ওরা গায়েব করে ফেলেছে।’
আইনশৃঙ্খলায় অবনতি
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের দিকে যায়।
ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বাড়িতে চুরি-ডাকাতির পাশাপাশি সেসময় ট্রেন এবং লঞ্চেও অহরহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যার খবর ছাপা হয় তখনকার পত্রপত্রিকায়।
১৯৭৫ সালের ১১ আগস্ট দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তেমনি একটি ট্রেন ডাকাতির খবর ছাপা হয়।
‘দুর্ধর্ষ ট্রেন ডাকাতি’ শিরোনামের খবরটিতে বলা হয়েছে, ঠিক আগের রাতে চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদীগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।
সেখানে বাধা দিতে গেলে ডাকাত দলের সদস্যরা শতাধিক রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করে। সেই গুলিতে দুই যাত্রী নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হন বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান
চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান
১৯৭৫ সালের শুরুতে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির শীর্ষ নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যা করে পুলিশ।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় চরমপন্থী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা তাদের সহিংস তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে দেশের ‘শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে’ বলে জানায় তৎকালীন সরকার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বহারা পার্টিসহ চরমপন্থী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী।
সেই অভিযানের খবরাখবর নিয়মিতভাবেই তখনকার পত্রপত্রিকায় বের হতে থাকে। সেখানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে মাঝেমধ্যেই চরমপন্থী নেতাকর্মীদের নিহত হতে দেখা যায়।
কম ক্ষেত্রেই সরকারি বাহিনীর সদস্যদের হতাহত খবর পাওয়া যায়।
১৩ আগস্ট, অর্থাৎ শেখ মুজিব নিহত হওয়ার দুদিন আগে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তেমনই একটি খবরের শিরোনাম: ‘৪ জন চরমপন্থী নিহত, ১ জন গ্রেপ্তার’।
খবরটিতে বলা হয়েছে, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অভিযান চালাতে গেলে ‘চরমপন্থীরা’ রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি নিক্ষেপ শুরু করলে তারাও পাল্টা গুলি চালায়।
এতে চরমপন্থী সংগঠনের চার সদস্য ঘটনাস্থলে নিহত হন। এ ছাড়া অপর একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকিরা পালিয়ে যান।
১৯৭৫ সালের পত্রিকায় বন্যার খবর
১৯৭৫ সালের পত্রিকায় বন্যার খবর
প্রথমে খরা, তারপর বন্যা
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের প্রভাব তখনো পুরোপুরি কাটয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। খাদ্য সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয় যে, আউশের মৌসুমে তারা যেন আরও বেশি জমিতে ধান চাষ করে।
কৃষকদের অনেকে এই আহ্বানে সাড়াও দেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই দেখা দেয় খরা।
১৯৭৫ সালের ৯ জুলাই প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবরের শিরোনাম: ‘পানির অভাবে আউশ ধানের গাছ শুকাইয়া যাইতেছে’।
সেখানে বলা হয়েছে, ভরা বর্ষা মৌসুমেও অনেক দিন বৃষ্টি না হওয়া ও সেচের অভাবে কুমিল্লা, নেত্রকোনা, কালিগঞ্জসহ দেশের অনেক এলাকায় আউশের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পানির অভাবে ধানের গাছ শুকিয়ে মরতে বসায় কৃষকরা চিন্তায় পড়ে গেছেন।
এ ঘটনার সপ্তাহ দেড়েকের মধ্যে ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে দেশে দেখা দেয় আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। খরার পর শুরু হয় একটানা বৃষ্টি।
এই অতিবৃষ্টি ও উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দেয়।
এতে আউশের ফসলসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির পাশাপাশি বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে, বন্যা কবলিত এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা যায়। সেইসঙ্গে, তীব্র হয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
১৯৭৫ সালের শুরুতে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেখ মুজিব
১৯৭৫ সালের শুরুতে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেখ মুজিব
সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ
সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, বেশকিছু কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে তখন অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল।
বিশেষ করে, দলীয় নেতাদের চাপের মুখে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্তে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
এ ছাড়া সেনাবাহিনীর একাংশ শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে পারছিলেন না বলেও জানা যায়।
‘এ সময় তরুণ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কিছু অংশ দারুণ ক্ষেপে ওঠে। তারা ভেতরে ভেতরে দল পাকাতে থাকে,’ নিজের বইতে লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ।
পদ-পদবী ঘিরে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দেয়।
অন্যদিকে, রক্ষীবাহিনীর সুযোগ-সুবিধা ঘিরেও সেনাদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যেই একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে।
‘ক্যান্টনমেন্টে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, শেখ সাহেব সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করে ভারতীয় সহযোগিতায় রক্ষীবাহিনীকে গড়ে তুলছেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে রক্ষীবাহিনীকে সাজিয়ে দিচ্ছেন। রক্ষীবাহিনীর জন্য নতুন নতুন ব্যারাক, নতুন গাড়ি, নতুন ইউনিফর্ম সেনাবাহিনীর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে,’ সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন।
এর বাইরে, বিভিন্ন ইস্যুতে সেনাবাহিনীর তরুণ কিছু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা ঘিরেও অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন মি. হামিদ।
ভারতের সঙ্গে শেখ মুজিবের সুসম্পর্ককে সেনাবাহিনীর অনেকেই সেসময় সন্দেহের চোখে দেখতেন
ভারতের সঙ্গে শেখ মুজিবের সুসম্পর্ককে সেনাবাহিনীর অনেকেই সেসময় সন্দেহের চোখে দেখতেন
দুর্নীতিরোধে অভিযান
বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেটার ফলে তৎকালীন সরকার যে ক্রমেই সাধারণ মানুষের সমর্থন হারাচ্ছিল, একপর্যায়ে তিনি নিজেও সেটি টের পান।
তখন দুর্নীতি ও চোরাচালান বন্ধে বেশ কয়েক দফায় অভিযানও চালায় তার সরকার। এর মধ্যে সবশেষ অভিযানটি শেখ মুজিব শুরু করেছিলেন নিহত হওয়ার সপ্তাহ তিনেক আগে।
জুলাইয়ের শেষভাগের ওই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিরুদ্ধে। ফলে সেসময়ের পত্রপত্রিকায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা এবং গ্রেপ্তার হওয়ার খবর নিয়মিতভাবে ছাপা হতে দেখা যায়।
১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তেমনই একটি খবরের শিরোনাম: ‘সাত লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩ জন গ্রেপ্তার’।
খবরটিতে বলা হয়েছে যে, ব্যাংকের ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তিন কর্মকর্তা সরকারি প্রায় ৭ লাখ সাড়ে ২৭ হাজার টাকা সমমূল্যের সিমেন্ট তুলে বিক্রি করে, সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে জানতে পারে দুর্নীতি দমন সংস্থা। পরে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিমন্ত্রী বরখাস্ত
১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন যোগাযোগে প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মি. মঞ্জুরকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে ‘সতর্ক করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার’ লক্ষ্যে মন্ত্রিসভার ওই সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মি. মঞ্জুরকে ২১ জুলাই একটি চিঠি পাঠান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান।
পরের দিন প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে সেই চিঠির বর্ণনা খবরে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে: ‘আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮ (৫) ধারার আওতায় আমি আপনাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ হইতে অপসারণ করিতেছি।’
১৯৭৫ সালে অভ্যুত্থান ঘটানোর আগে শেখ মুজিবের বাসভবন রেকি করেন জড়িত সেনা কর্মকর্তারা
১৯৭৫ সালে অভ্যুত্থান ঘটানোর আগে শেখ মুজিবের বাসভবন রেকি করেন জড়িত সেনা কর্মকর্তারা
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা
সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারের পতন এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানকে।
তখনকার প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সার রেজিমেন্টের এই কর্মকর্তা বেশ সময় নিয়ে পরিকল্পনাটি করেছিলেন এবং সেটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৫ আগস্টের কয়েক সপ্তাহ আগে অন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়।
কিন্তু সেনাবাহিনীর একজন জুনিয়র কর্মকর্তা মেজর ফারুক, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও বটে, তিনি কেন হঠাৎ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা করলেন?
‘ফারুক ছিল বড়ই আবেগপ্রবণ। দেশের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার অপব্যবহার, খুন, হাইজ্যাকিং ইত্যাদি অবলোকন করে সে ভীষণভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে,’ নিজের বইতে লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘দেশ ক্রমাগত ভারতের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে, শেখ মুজিব দেশকে ভারতের সেবাদাস বানিয়ে ফেলছেন, ফারুকের ভেতরে এই ধারণা প্রবল মানসিক যন্ত্রণার উদ্রেক করে। পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা ভারতের শৃঙ্খল পরতে রাজি নই,’ এই ছিল ফারুকের কথা।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথাটি মেজর ফারুক প্রথমে জানান সেনাবাহিনীর আরেক মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদকে। সম্পর্কে তারা দুজন ছিলেন ভায়রা ভাই।
১২ আগস্ট রাতে আলোচনা করে তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ১৫ তারিখকে বেছে নেয় বলে ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রস্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
মোশতাকের সঙ্গে বৈঠক
সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত এবং জোরপূর্বক অবসর দেওয়ার ক্ষুব্ধ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে মেজর ফারুক এবং মেজর রশিদের যোগাযোগ হয়।
চাকরি হারানোর ফলে ক্ষুব্ধ ওইসব কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মেজর শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা এবং সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান।
এর বাইরে, একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও অভ্যুত্থানে অংশ নেন, যার নাম বজলুল হুদা।
সামরিক এসব কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেন অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারী সেনা কর্মকর্তারা।
তাদের মধ্যে শুধু খন্দকার মোশতাক আহমেদের কাছ থেকেই তারা ইতিবাচক সাড়া পান।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার বইতে লিখেছেন যে, ১৯৭৫ সালের দোসরা আগস্ট শেখ মুজিব সরকারের মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন মেজর রশিদ।
তারা দুজনই ছিলেন কুমিল্লা, তথা একই এলাকার বাসিন্দা।
‘মোশতাক আহমেদ শেখ সাহেবের সর্বশেষ কার্যকলাপে সন্তুষ্ট ছিলেন না। মুক্তির উপায় খুঁজছিলেন। অতএব, রশিদ তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে সহজেই বুঝতে পারে, প্রয়োজন মুহূর্তে এই বুড়োকে ব্যবহার করা যাবে,’ লিখেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ।
পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় যে, শেখ মুজিবকে উৎখাত ও হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিবেন এবং সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ সামাল দিবেন।
স্বাধীনতার আগে শেখ মুজিবের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল, যারে ধীরে ধীরে কমতে দেখা যায়
স্বাধীনতার আগে শেখ মুজিবের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল, যারে ধীরে ধীরে কমতে দেখা যায়
শেষমুহূর্তের ‘রেকি’
১৫ আগস্ট চূড়ান্ত আঘাত হানার আগের দিন ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে অবস্থিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ও এর আশপাশে রেকি বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসেন অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা।
শেখ মুজিব হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী সুবেদার গণি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ১৪ আগস্ট বিকালে মেজর ডালিমকে তিনি শেখ মুজিবের বাসভবনের সামনে মোটর সাইকেলে করে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিলেন।
এর বাইরে, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকেও সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার এলাকায় দেখা গিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
এ ছাড়া সেনানিবাসের টেনিসকোর্টেও মেজর ডালিমসহ চাকরিচ্যুত বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে দেখা যায় বলে নিজের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ।
এরপর নিয়মিত মহড়ার নামে অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা রাতে ট্যাংক, অস্ত্র এবং সৈন্য-সামন্তসহ ঢাকা সেনানিবাসে একত্রিত হন। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর ১৫ আগস্ট ভোরে তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।
বত্রিশ নয়, নিরাপত্তা জোরদার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাতের শেষভাগে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করতে অভ্যুত্থানকারী সেনারা যখন ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে যান, তখন তাদের প্রতিহত করার মতো তেমন জোরদার পাহারা সেখানে ছিল না বলে পরবর্তীতে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে আসে।
বরং সেদিন নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। কারণ ১৫ আগস্ট সকালে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের। এজন্য যাবতীয় প্রস্তুতিও শেষ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যেই সেখানে বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। কারা ওই হামলা চালিয়েছিল সেটি জানা যায়নি। তবে হামলার পর পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নজরদারী সেখানে আরও বাড়ানো হয়েছিল বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে শেখ মুজিবের বাসভবন ছিল অনেকটাই অরক্ষিত। যারা সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলা-বারুদ মজুদ ছিল না বলেও পরে তদন্তে উঠে আসে।
আগেও হামলা হয়েছিল
১৯৭৫ সালের আগস্টের আগেও শেখ মুজিবের ওপর হামলা হয়েছিল। যদিও বিষয়টি তখন জানাজানি হতে দেয়নি সরকার।
তবে ওই হামলার খবর তখন ওয়াশিংটনকে গোপন তার বার্তায় জানিয়েছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।
সেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ২১ মে বিকালে শেখ মুজিবের ওপর একদফা হামলা হয়। মুজিব অক্ষত থাকলেও এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তি আহত হন।
টিভি স্টেশন পরিদর্শন শেষে বাসায় ফেরার সময় তার ওপর ওই হামলাটি চালানো হয়েছিল। তবে সেটির সঙ্গে ঠিক কারা জড়িত, তা মার্কিন তার বার্তায় উল্লেখ করা হয়নি।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন পুলিশ কর্মকর্তা মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তাকে হামলার তথ্যটি নিশ্চিত করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে সরকারি সিদ্ধান্তে হামলাটির কথা জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। তথ্য অধিদপ্তর খবরটি প্রকাশ না করার জন্য পত্রিকাগুলোর কাছে কড়া নির্দেশনা পাঠিয়েছিল বলে মার্কিন গোপন বার্তায় বলা হয়।


