প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
মুন্সীগঞ্জের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফাহিম ইসলাম (ছদ্মনাম)। প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে প্রথম সারির ছাত্র ছিল ফাহিম। তবে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে তার ফল খারাপ হতে শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, এ পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মোবাইল আসক্তি। ফাহিম দিনের বড় একটি সময় পার করে স্মার্টফোনে গেমস খেলে। পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে বাধা দিলে ফাহিম ক্ষিপ্ত হয়ে বিরূপ আচরণ করে।
ফাহিমের মা বলেন, ‘শুরুতে ছেলেকে মোবাইল ফোন দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল পড়ালেখায় সহযোগিতা। কিন্তু ফাহিম এখন পড়ালেখা, খেলাধুলা কিংবা সমবয়সী কারো সঙ্গে মেলামেশাতেও আগ্রহী নয়। স্মার্টফোন নিয়ে একা সময় কাটাতেই সে বেশি পছন্দ করে।’
ছোট শিশুদের খাওয়ানো বা শান্ত রাখতে স্মার্টফোনে কার্টুন কিংবা আকর্ষণীয় কোনো কনটেন্ট দেখাচ্ছেন অনেক বাবা-মা। এভাবে একেবারে অল্প বয়স থেকেই শিশুরা স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এ আসক্তি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বেশির ভাগ শিশু-কিশোর মোবাইল ব্যবহার করছে তাদের অভিভাবকের নজরদারির বাইরে। শৈশব পেরোনোর আগেই স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। সম্প্রতি দেশের ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতির যে বিস্তার তাতে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে স্মার্টফোনে টিকটকের ব্যবহার।
শুধু ফাহিম নয়, বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশের শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে মোবাইল আসক্তি। ‘সুপারভাইজড অ্যান্ড আনসুপারভাইজড স্ক্রিন টাইম অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল হেলথ অব স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন ইন ঢাকা, বাংলাদেশ: ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর আচরণগত সমস্যা এবং ৩১ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি মানসিক সমস্যা রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
মাত্র ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার কাজে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। অবশিষ্ট শিক্ষার্থীরা বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার শুরুর পর ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ তাদের মনোযোগ কমে যাওয়া এবং ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী খারাপ ফলের কথা জানিয়েছে। ‘এক্সপ্লোরিং স্মার্টফোন ইউজ অ্যামং সেকেন্ডারি স্কুল স্টুডেন্টস ইন আ রুরাল স্কুল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রস-সেকশনাল পাইলট স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক (ভৌতবিজ্ঞান) আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান বলেন, ‘আমরা এখন শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগের তুলনায় মনোযোগহীনতা বেশি দেখতে পাই। তারা রিলস-ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় কোনো কিছু পড়ার বিষয়ে আগ্রহ কমে গেছে। মনোযোগ না দেয়ায় তারা ক্লাসের পড়া অনেক সময় সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। অভিভাবকদের কাছ থেকে আমরা প্রায়ই এমন অভিযোগ পাই যে কোনোভাবেই শিশুদের স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’
২০২৩ সালের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যার মধ্যে ‘টেক অন হার টার্মস’ও রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের—বিশেষ করে মেয়েদের—হয়রানি, অবাস্তব সামাজিক চাপ এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনগুলোয় আরো বলা হয়, ১০ বছর বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ততা পরবর্তী বয়সে তাদের সামাজিক ও আবেগীয় সমস্যার অবনতির সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষকরা দেখেছেন, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইন্টারনেট গেমে আসক্তি অনেকটা নেশাদ্রব্যে আসক্তির মতো। পর্দার বিনোদন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে। প্রাপ্তবয়স্ক তো বটেই, এমনকি শিশুদের মনেও এ ডোপামিন আনন্দের অনুভূতি এবং আসক্তি তৈরি করে।
স্ক্রিন টাইম অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল হেলথ অব স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন ইন ঢাকা, বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণায় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করা স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ৯৩ দশমিক ১ শতাংশ ঝাপসা দৃষ্টি, ৮০ শতাংশ মাথাব্যথা, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ চোখের সমস্যা, ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ ঘাড় ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঘুমের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভিট্রিও-রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নিলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক শিশু সারাদিন মোবাইল ব্যবহার করছে। এ মোবাইল আসক্তির কারণে শিশুদের মূলত দুটি সমস্যা হচ্ছে। একটি হলো দৃষ্টিস্বল্পতা। অর্থাৎ তারা দূরের জিনিস দেখতে অসুবিধা বোধ করছে। আরেকটি হচ্ছে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া। চোখ যখন শুকিয়ে যায়, তখন দেখতে অসুবিধা হয়, বারবার চোখ পিটপিট করতে হয়, চোখে খচখচ অনুভূতি হয়। আমরা অভিভাবকদের পরামর্শ দেব, শিশুদের ঘরের বাইরের প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা অন্য কোনো পরিবেশে নিয়ে যেতে হবে। খেলাধুলা ও গল্পের বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে।’
ইউনেস্কো জানাচ্ছে, শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশে নয়। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। গত কয়েক বছরে বিশ্বের একের পর এক দেশ স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার নীতি গ্রহণ করেছে। স্মার্টফোনকে শিশুদের মনোযোগ নষ্টকারী এবং সুস্থতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ১১৪টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যালয়ে শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের মোট দেশের ৫৮ শতাংশ এখন এ নীতি গ্রহণ করেছে। ২০২৩ সালে এমন নিষেধাজ্ঞা ছিল মাত্র ২৪ শতাংশ দেশে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে এ হার বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ তা আরো প্রায় ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ক্রোয়েশিয়া, জর্জিয়া, মালদ্বীপ ও মাল্টা।
যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে তাদের মধ্যে সঠিক সময়ে কথা বলা, পারস্পরিক যোগাযোগ দক্ষতা তৈরির মতো বিষয়গুলো ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ইনসাফ বারাকাহ কিডনি ও জেনারেল হাসপাতালের স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বিভাগের কনসালট্যান্ট এবং স্পিচ এইড বাংলাদেশ লিমিটেড সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক কৌশিক আহাম্মেদ কবির বলেন, ‘শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার তাদের সামগ্রিক বিকাশের সমস্যার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকা অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখা, পালাক্রমে কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগ ও বাস্তব খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে ভাষা ও যোগাযোগের স্বাভাবিক অনুশীলন ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি ঘুমের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, খিটখিটে মেজাজ ও পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।’
দেশে শিশু-কিশোরদের প্রায় ৫৬ শতাংশই মোবাইল ব্যবহার করে অভিভাবকের নজরদারির বাইরে। ‘স্ক্রিন টাইম অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল হেলথ অব স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় পাওয়া যায় এ তথ্য। এমন পরিস্থিতি শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক শিশু স্মার্টফোনের সূত্রে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে আবার অনেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে স্মার্টফোনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রুপ ও যোগাযোগকে কেন্দ্র করে।
সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার শিকার হন। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে অপ্রতিম তার মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ছবি তোলার উদ্দেশ্যে। নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা ও সালমানপুর এলাকার লালমাই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অপ্রতিমের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে যে তিনজন সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে মূল হত্যাকারী তুহিনের বয়স ১৯ বছর এবং বাকি দুজনের বয়স ১৫ ও ১৬ বছর। তারা টিকটককেন্দ্রিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে পরিচয় ছিল। মূলত আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যা করেন তারা।
কুমিল্লা শহরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই দেশীয় অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মহড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। স্থানীয় ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব কিশোর গ্যাং মূলত গড়ে উঠেছে টিকটক ভিডিওকে কেন্দ্র করে। বুধবার কুমিল্লায় ‘কিশোর গ্যাং’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুধু কুমিল্লাই নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য অন্তত ৪ হাজার ২৫০ জন। সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ঢাকা মহানগরে। এখানে ১৫৯টি গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার বাইরে সক্রিয় রয়েছে ২২৭টি গ্যাং, যেগুলোর সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরে—৯৮টি। এছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলায় রয়েছে আরো ৮১টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, হামলা, মাদক সেবন-ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগের মতে, শিশু-কিশোররা মোবাইল থেকে অনুকরণ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবার কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে যা দেখে, তা অনুকরণ করতে চায়। তারা স্মার্টফোনে নানা ধরনের কনটেন্ট, রিলস-ভিডিও দেখে এবং সেখান থেকে শেখা বিষয়গুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে অনলাইনে দেখা বিষয়গুলোকে তারা বাস্তব ও স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন গ্যাং। এসব গ্রুপকে অনুসরণ করতে গিয়ে তারা প্রচলিত সামাজিক নীতি-নৈতিকতার বাইরে যেতে শুরু করে। সেখান থেকে স্কুল পালানো, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। ছোটখাটো অপরাধ থেকে একপর্যায়ে তারা সহিংস অপরাধের দিকে ধাবিত হতে পারে।’
শিশুদের মোবাইল আসক্তি থেকে বের করতে হলে পারিবারিক সচেতনতা বেশি জরুরি বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে প্রথমেই পরিবার ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একটি কালেক্টিভ অ্যাপ্রোচ— যেখানে পরিবার, সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
শিশুদের মোবাইল আসক্তি ও বিভিন্ন নেতিবাচক চর্চায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে খেলার মাঠ না থাকাসহ শিশুদের উপযোগী বিনোদনের ঘাটতিকে কারণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মোবাইল আসক্তির পেছনে নগর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। নগরীতে পর্যাপ্ত মাঠ নেই। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় মাঠ নেই। আমাদের নগর নীতি ধীরে ধীরে শিশুদের মাঠবিমুখ করে মানসিকভাবে ‘বিকলাঙ্গ প্রজন্ম’ তৈরি করছে। শিশুর বিকাশের বিষয়টি এদেশের সরকারের গুরুত্বের তালিকায় নেই।’
বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার প্রবণতা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চালু করে। এর পর চলতি বছরের মার্চে ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া শুরু করে। একই পথে হেঁটেছে মালয়েশিয়া। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও ২০২৭ সালের শুরু থেকে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মোবাইল ফোন আসক্তি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় বাংলাদেশেও এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. একেএম রেজাউল করিম বলেন, ‘কেবল মোবাইল ব্যবহার করলেই কোনো শিশু অপরাধে জড়িয়ে পড়ে না—বরং তারা ডিভাইসে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে (যেমন: সাইবার বুলিং, নেতিবাচক কনটেন্ট, এক্সপ্লয়েটেশন) সেটাই মুখ্য। অনুকরণপ্রিয় শিশুরা অনলাইনের এ-জাতীয় ক্ষতিকর বিষয়গুলো দেখে বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত হতে পারে। শিশুদের স্ক্রিনটাইম বাড়ার অন্যতম কারণ তাদের খেলার সুযোগ বা বিকল্প বিনোদনের অভাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সময়ে শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠায় ডিজিটাল ডিভাইস বা মোবাইল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডিভাইস ব্যবহারের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিশুদের অবসর বা বিনোদনের জন্য ডিভাইস ছাড়াও বিকল্প কিছুর সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দেয়া দরকার। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেটে অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর কনটেন্টের প্রচার বন্ধে নীতিমালা তৈরি করার পাশাপাশি বয়সভিত্তিক কনটেন্টের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় এ বিষয়ে আরো গবেষণা এবং সুরক্ষামূলক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’


