প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ডলার সংকটে এপ্রিলে কোনো এলসি খুলতে না পারায় মে মাসে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য কোনো কয়লা আসেনি। এমন অবস্থায় সোমবার (৫ জুন) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পায়রা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের খামখেয়ালিকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকৌশলী জোবায়ের আহমেদ সকাল ১০টার দিকে পায়রা থেকে টেলিফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যমতে, ৪০০ টনের মতো কয়লা মজুদ রয়েছে। বড়জোর এ কয়লা দিয়ে সাড়ে ১২টা নাগাদ কেন্দ্রটি চালানো যেতে পারে। সেই হিসাবে আর দুই ঘণ্টা পরই আসলে কেন্দ্রটি বন্ধ হবে।’
কয়েকদিন ধরে দেশে আলোচিত ঘটনা সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা বন্ধ হচ্ছে। ফলে লোডশেডিং পরিস্থিতির মধ্যে পয়রা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
দেশের কোনো কোনো উপজেলায় মাইকিং করে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রর কয়লা সংকটের বিষয়টি সাধারণ মানুষকে জানানো হয়েছে। এ জন্য বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
দেশের এখন মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ ভাগই এককভাবে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসে। কেন্দ্রটি সংকটের মধ্যে প্রতিদিনই ফুল লোডে অর্থাৎ ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।
কিন্তু কয়লা সংকটে মে মাসের শেষদিকে একটি ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্য ইউনিটটিরও উৎপাদন কমানো হয়। এখন সেই ইউনিটটিও বন্ধ হয়ে গেল।
বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ, কেন্দ্রটির কয়লা আমদানির জন্য ডলার চেয়ে বারবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহি চৌধরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব হাবিবুর রহমান, পিডিবি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান এবং বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালন এএম খোরশেদুল আলম দফায় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ডলার সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, চীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য আর কয়লা আমদানি করে দিতে না চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের সংস্থান করে দিতে সম্মত হয়। ততক্ষণে কেন্দ্রটির জন্য কয়লা ফুরিয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সংকট মেটানোর বিষয়টিতে আগে গুরুত্ব দিলে পয়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হতো না।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্র বলছে, কেন্দ্রটির কয়লা আমদানি করে চীনা অংশীদার প্রতিষ্ঠান সিএমসি। ছয় মাসের বিলম্বিত পরিশোধ ঋণপত্রের সুবিধায় সিএমসি পায়রাকে কয়লা এনে দেয়। কিন্তু সিএমসির ছয় মাসের দেনা নয় মাসেও শোধ করতে পারেনি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এতে শুধু কয়লার দাম ৩০০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পড়ে। এর প্রেক্ষিতে চীনা বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক নড়েচড়ে বসে। তারা কেন্দ্রটির বকেয়া ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের খবরে সারাদেশে লোডশেডিং আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) দেশের সব উপজেলায় মাইকিং করে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় এ ধরনের মাইকিং করা হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনু সাহার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কোনো মাইকিং করিনি। পল্লীবিদ্যুৎ অফিস থেকে জানানো হয়েছে এ ধরনের মাইকিং ওপরের নির্দেশে করা হয়েছে।’
পরে স্থানীয় পল্লীবিদ্যুতের ডিজিএম মো. মমিনুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, হেড অফিসের নির্দেশে তারা মাইকিং করেছে। লোডশেডিং পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে তারা শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি জানান, তিনি দিনের বেলা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। রাতে পাচ্ছেন আরও কম। রবিবার দিবাগত রাতে ১৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে কালিয়া উপজেলায় মাত্র ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিন ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে।


