Homeসংবাদজমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি ও করহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমাবে

জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি ও করহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমাবে

প্রাইম ভিশন ডেস্ক »

আগামী অর্থবছর থেকে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি ও করহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমাবে সরকার। এই বড় কর্তনের পাশাপাশি মৌজা মূল্য থেকে সরে এসে বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এসব সম্পত্তির দলিল মূল্য নির্ধারণ করা হবে। কৌশলী এই পদক্ষেপ—আবাসনখাতে কালো টাকার অপ্রতিরোধ্য দাপট কমিয়ে— সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বিভিন্ন ধরণের কর ও ফি রয়েছে। আগামী অর্থবছর এটি কমিয়ে ৮ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে।

সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা ক্রেতা-বিক্রেতাকে বড় ধরণের কর ছাড় দেওয়ার পরও— আবাসন খাতে স্বচ্ছতা ও রাজস্ব আহরণ বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সভায় আইন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জমির আনুষ্ঠানিক রেকর্ডের সবচেয়ে ছোট ইউনিট হচ্ছে মৌজা। নিবন্ধিত মূল্যকে বিবেচনায় নিয়ে জমির মৌজা মূল্য নির্ধারণ করে সরকার। প্রায় সকল দলিল মৌজা মূল্যে নিবন্ধিত হয়, যা সাধারণত প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম হয়। জমি ও ফ্ল্যাটের মৌজা মূল্য বাজার মূল্যের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় বর্তমানে, বেশিরভাগ ক্রেতা-বিক্রেতা বেশি দামে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচা করলেও— রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্য মৌজা মূল্য অনুযায়ী কম দাম দেখিয়ে দলিল করে। দলিল মূল্যের অতিরিক্ত টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেন করে, যা মূলত কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ। এতে বিপুল রাজস্ব বঞ্চিত হয় সরকার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি ও কর বাবদ সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে উৎসে কর বা গেইন ট্যাক্স থেকে, যার পরিমাণ ৬ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার কর বাবদ ৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা। এছাড়া, রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ১ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে সরকার। বেসরকারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের তথ্যমতে, বাজারমূল্যের তুলনায় কম দাম দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন হওয়ায়— প্রতিবছর সরকার প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারায়।

তাই সরকার এ সমস্যার সমাধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত কর কমানো সত্ত্বেও যদি সম্পত্তি প্রকৃত বাজারমূল্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে মোট রাজস্ব আয় বরং বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে টিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাত বা অন্য কোনখাতের জন্যই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “আমরা বরং চেষ্টা করছি, জমির মৌজা মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে করহার কমাতে। যেমন ধরুন গুলশানে জমির মৌজা মূল্য ১৫ লাখ টাকা কাঠা। অথচ সেখানে এক কাঠা জমির প্রকৃত দাম ৫ কোটি টাকা। এই ব্যবধানের ফলে যিনি বিক্রি করেন, তিনিও এখন কালো টাকার মালিক হয়ে যান। তাদের অনেকে বিপদে পড়েছেন। এটা বন্ধ করতে আমি ল্যান্ডের দাম বাড়িয়ে ট্যাক্স কমিয়ে দেব। এই কেনাবেচায় লেনদেন করা টাকা অবশ্যই সাদা হবে, সরকারও প্রায় সমপরিমাণ রাজস্ব পাবে।”

বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত কর, ফি

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি ১ শতাংশ, যা আগামী অর্থবছরও অপরিবর্তিত থাকবে। তবে স্ট্যাম্প ফি ১.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করতে পারে এনবিআর। তবে স্থানীয় সরকারের আয়ে যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেজন্য বিদ্যমান স্থানীয় সরকার করহার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে স্থানীয় সরকার কর হয়েছে।

জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের সময় গেইন ট্যাক্স বা উৎসে কর সকল ক্ষেত্রে অর্ধেক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বর্তমানে ঢাকার ক-ঘ শ্রেণীর ক্ষেত্রে উৎসে কর ৮ শতাংশ, এবং ঙ- শ্রেণীর ক্ষেত্রে এবং চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ উৎসে কর রয়েছে। নতুন অর্থবছর থেকে ঢাকার ক-ঘ শ্রেণীর ক্ষেত্রে উৎসে কর ৪ শতাংশ, এবং ঙ- শ্রেণী এবং চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করা হতে পারে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকা বাদে— অন্যান্য পৌরসভার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, পৌরসভা ব্যাতিত অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎসে কর বিদ্যমান ২ শতাংশ হতে কমিয়ে ১ শতাংশ আরোপ করা হতে পারে।

বর্তমানে শহর এলাকায় কাঠাপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা উৎসে কর নির্ধারণ করা আছে। আগামী অর্থবছর থেকে বাজারমূল্য অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন হলে, এ ধরণের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমার প্রয়োজন হবে না বলে মনে করছে এনবিআর।

ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে বর্তমানে ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ২ শতাংশ, এবং ১,৬০০ বর্গফুটের চেয়ে বেশি হলে ৪.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। নতুন অর্থবছরে ১,৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ভ্যাটহার ১ শতাংশ, এবং ১৬০১-২৪০০ বর্গফুট পর্যন্ত ২ শতাংশ এবং ২,৪০০ বর্গফুটের বেশি হলে ৩ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হতে পারে।

এছাড়া, বর্তমানে রেজিস্ট্রেশনের সময় ভূমি উন্নয়ন ফি বাবদ ২ শতাংশ ফি রয়েছে, যা আগামী অর্থবছর ১ শতাংশে এ নামিয়ে আনা হতে পারে।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়