প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
গণ-অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরের বছর ২০২৫ সালে অপরাধের সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এছাড়া খুন, দস্যুতা ও মব সন্ত্রাসের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার প্রভাবেই এ ধরনের অপরাধ বেশি ঘটছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
সারা দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলার তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধের পরিসংখ্যান তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উদ্ধার-সংক্রান্ত মামলাসহ মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি মামলা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের কিছু মামলাও রয়েছে। এতে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দায়ের হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা। সূত্র : বণিকবার্তা।
গত বছর সব মিলিয়ে ২১ হাজার ৯৩৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। এর পরই রয়েছে চুরির মামলা। বছরজুড়ে ১২ হাজার ৭৪০টি চুরির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর পরই খুনের মামলা। সারা বছরে ৩ হাজার ৭৮৫টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। দস্যুতার ঘটনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। সারা বছরে ১ হাজার ৯৩৫টি দস্যুতার মামলা নথিভুক্ত হয়েছে পুলিশের খাতায়। এছাড়া ডাকাতির ঘটনায় ৭০২টি, দ্রুত বিচার আইনে ৯৮৮, দাঙ্গার ঘটনায় ৬৬, অপহরণের ঘটনায় ১ হাজার ১০১টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় ৬০১টি ও অন্যান্য মামলা হয়েছে মোট ৮১ হাজার ৭৩৮টি।
গত বছর সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু রোজা মণি হত্যার ঘটনাটি ছিল বেশ আলোচিত। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে নিখোঁজের একদিন পর ১৩ মে বিজয় সরণি ওভারপাসের কাছে তেজকুনিপাড়ার ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। শিশুটির দেহে ছিল ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্ন। শরীরে গরম পানি ঢেলে নির্মম নির্যাতনের পর শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের। কেবল রোজা মণিই নয়, গত বছর রাজধানীতেই অন্তত এক হাজার শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হয় তেজগাঁও ও মিরপুর অঞ্চলে। কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। নবাবগঞ্জে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রী তার শিক্ষকের হাতে নির্যাতিত হয় বলে অভিযোগ করে ভুক্তভোগীর পরিবার। এ ঘটনায় মামলা হলে গ্রেফতারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন মো. আলী আসলাম নামের ওই শিক্ষক।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার প্রভাবেই নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ অনেক বেশি সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে আমরা অপরাধের পরিসংখ্যানে ভয়াবহ কিছু দিক দেখেছি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার প্রভাবে অপরাধ অনেক বেশি সংঘটিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নারী ও শিশুদের ওপর। তাদের আইনগত ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি এখনো অনেক ঢিলেঢালাভাবে কার্যকর হচ্ছে। যদিও তাদের সুরক্ষায় অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু ওইসব আইনের বাস্তবায়ন হয় না।
নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মব সন্ত্রাসের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ততা ছিল কিশোর অপরাধীদের। এমনকি কিশোর গ্যাং ও জনসংখ্যার বিপরীতে এর সদস্য সংখ্যা, সহিংস অপরাধে সম্পৃক্ততা এবং শিশু-কিশোর নিয়োগপ্রবণতার তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে করা বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ। ১৫ পয়েন্ট নিয়ে এ তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে এল সালভাদর। এরপর যথাক্রমে হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, জ্যামাইকা, ফিলিপাইন ও নাইজেরিয়ার অবস্থান। এ তালিকায় ৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোয় কিশোর গ্যাং কার্যক্রম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সাধারণত ১৩-১৯ বছর বয়সী হয়ে থাকে। তারা স্থানীয় মহল্লাভিত্তিক আধিপত্য, মাদক ব্যবসা ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় থাকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান চালালেও তাদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের মতো একই পয়েন্ট নিয়ে কিশোর অপরাধের বৈশ্বিক সূচকে ১৩তম অবস্থানে ভারত এবং ১৪তম অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘এ ধরনের গুরুতর অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করেছে।


