Homeসংবাদযেকোনো সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ

যেকোনো সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি পদত্যাগের ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নিয়েছেন বলে  নিশ্চিত করেছে বঙ্গভবনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। তবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারেরও ‘সবুজসংকেত’ রয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে তখন মাঠ ছিল দারুণ গরম। এমনকি বিক্ষোভকারীরা চলে যায় বঙ্গভবনের কিনারা পর্যন্ত। ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষায় তখন বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভকারীদের সামাল দিয়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সাহাবুদ্দিন। সরকারের পাঁচ মাসের মাথায় এখন নতুন করে আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ইস্যুটি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।

বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা গতকাল বুধবার বিকালে আলাপকালে খুব স্পষ্ট করেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। তিনি বললেন, ‘রাষ্ট্রপতি আজ-কাল-পরশু বা চলতি মাসের যেকোনো দিন পদত্যাগ করতে পারেন।’ ওই কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির ‘অসুস্থতা’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি অসুস্থ। তিনি নিউরো জটিলতায় ভুগছেন। সম্প্রতি তিনি দুইবার সিএমএইচে এমআরআইসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছেন। চিকিৎসকরা তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই পদত্যাগের বিষয়টি সহজভাবে ভাবছিলেন সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রীদের শপথ পড়ানোর পর এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও তিনি জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি তখন তারেক রহমানকে বলেছিলেন, ‘আপনারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এখন রাষ্ট্রপতি আপনারা নির্বাচিত করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আমিও এ ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।’ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কেউ কেউ দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাদের আলাদা কোনো সখ্য গড়ে ওঠেনি। তিনি তার সাংবিধানিক দায়িত্বই পালন করে চলছেন।

‘দুঃসময়ে শতভাগ সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নামে চিনত। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেয়।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা চক্রান্ত হয়েছে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।’ ওই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপ্রধান।

পাবনা থেকে বঙ্গভবনে

তথ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরের শিবরামপুরের জুবিলি ট্যাংক পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শরফুদ্দিন আনসারী, মায়ের নাম খায়রুন্নেসা। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৯-৭০ সালে অবিভক্ত পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং ১৯৭০-৭৩ সালে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাবনা টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দেন।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মো. আরশাদ আদনান তাদের একমাত্র সন্তান। তার দুই যমজ নাতি তাহসিন মো. আদনান ও তাহমিদ মো. আদনান। ভ্রমণ, বই পড়া ও গান শোনা রাষ্ট্রপতির প্রিয় শখ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়