Homeসংবাদআরব আমিরাতে বসবাসকারী ১২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্বেগ–উৎকণ্ঠায়

আরব আমিরাতে বসবাসকারী ১২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্বেগ–উৎকণ্ঠায়

প্রাইম ভিশন ডেস্ক

সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া না হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিসা অটো বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শ্রমবাজারে অটো ভিসা বাতিলের ঘটনায় লাখ লাখ প্রবাসীর মাঝে ভিসা বাতিলের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর ছুটি কাটাতে দেশে এসে অনেকে ফের কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারছেন, তাদের ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি ছুটি কাটাতে দেশে আসার সাহস করছেন না। আবার অনেকে ব্যবসা–বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগের মধ্যে দিনযাপন করছেন। যারা দেশে এসেছেন তারা তড়িঘড়ি করে ফিরে যাচ্ছেন। এতে করে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটের ভাড়াও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সবকিছু মিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ১২ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী উদ্বেগ–উৎকণ্ঠায় আছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা বাতিলের অনেক ঘটনা ঘটেছে। অনেকে ফোন করে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছেন। অনেকে ধর্ণা দিচ্ছেন দূতাবাসে। কিন্তু আরব আমিরাত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভিসা বাতিলের কোনো ঘোষণা দেয়নি। কতজনের ভিসা বাতিল হয়েছে সেই তথ্যও প্রকাশ করেনি। কেন অটো ভিসা বাতিল হয়ে যাচ্ছে সেই সম্পর্কেও প্রবাসীরা পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছেন। দূতাবাস থেকেও তারা কোনো তথ্য পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। সূত্র আজাদী।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের অধিকাংশ নির্মাণ, পরিবহন, শিল্পকারখানা, সেবা খাত, হোটেল–রেস্তোরাঁ, নিরাপত্তা, বন্দর, গৃহকর্ম এবং ব্যবসায় নিয়োজিত। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌদি আরবের পর আমিরাত অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই দেশ থেকে। সেই দেশের শ্রমবাজারে এমন অবস্থা দেশের অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদের মাঝে ‘অটো ক্যান্সেল’ শব্দটি ব্যাপকভাবে আতংক ছড়ালেও ওই দেশের সরকারিভাবে বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, সরকার ঘোষণা না দিয়ে বিশেষ কোনো কৌশলে বাংলাদেশি প্রবাসীদের উপর খড়্‌গ চালাচ্ছে কি না সেটা খুঁজে বের করা জরুরি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিদ্যমান আইনে নিয়োগকর্তা চাকরি শেষ হওয়ার পর ভিসা বাতিল করে দিতে পারেন, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেলে কর্মীদের ভিসা বাতিল হয়ে যায়। কর্মীর বিরুদ্ধে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করেছে এমন রিপোর্ট দেওয়া, শ্রম আদালতে বিরোধ বা আইনি জটিলতা, কর্মীর অজান্তে স্পন্সর পরিবর্তন, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করা, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া প্রভৃতি কারণে ভিসা বাতিল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শ্রমিক মনে করেন চাকরি থাকলে ভিসাও থাকবে। কিন্তু বাস্তবে নিয়োগকর্তা অনলাইনে ভিসা বাতিল করে দিলে কর্মী অনেক সময় তা জানতে পারেন না। বিমানবন্দরে গিয়ে বিষয়টি প্রথম জানতে হয়। এক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটছে কি না তাও কেউ নিশ্চিত নন। তবে ইতোমধ্যে শত শত মানুষের ভিসা অটো ক্যান্সেল হয়েছে।

বোয়ালখালীর কামাল উদ্দিন দুই মাস আগে দুবাই থেকে দেশে বেড়াতে আসেন। অটো ক্যান্সেলের কথা শুনে তিনি আগেভাগে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। চড়া দামে টিকেট এগিয়ে এনে বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। কামাল উদ্দিনের ব্যবসা এবং দোকান সবই রয়েছে দুবাইয়ে। এখন তিনি চোখে–মুখে অন্ধকার দেখছেন। কামাল বন্ধু এবং পরিচিতজনদের অনেকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তাদের কেউ কেউ ওই দেশে থেকেও ভিসা ক্যান্সেলের শিকার হয়েছেন বলে জানতে পারেন।

আমিরাতের বিদ্যমান অভিবাসন বিধি অনুযায়ী, অধিকাংশ সাধারণ রেসিডেন্স ভিসাধারী টানা ১৮০ দিনের (ছয় মাস) বেশি দেশের বাইরে থাকলে সেই ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, যদি না বিশেষ কোনো অনুমতি বা ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হয়। তবে সাম্প্রতিক অনেক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছয় মাসের কম সময় বাংলাদেশে ছিলেন। সেসব ক্ষেত্রে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে স্পন্সরের মাধ্যমে ভিসা বাতিল।

ট্রাভেল এজেন্সি সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক যাত্রী বাংলাদেশ থেকে বোর্ডিং পাস নিতে গেলে এয়ারলাইন্সের সিস্টেমে দেখা যায় তার ভিসা আর বৈধ নেই। ফলে তাকে বিমানে উঠতে দেওয়া হয় না। কেউ কেউ আবার দুবাই বা আবুধাবিতে পৌঁছেও ইমিগ্রেশনে সমস্যায় পড়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে আসার সাহস করছেন না। বাবা–মায়ের মৃত্যু, সন্তানের বিয়ে কিংবা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে ছুটি পেলেও দেশে না এসে আমিরাতে অবস্থান করছেন অনেক বাংলাদেশি। তারা বলেছেন, ভিসা বাতিল হয়েছে কি না না জানলেও চাকরি কিংবা ব্যবসা–বাণিজ্য করছেন। কখনো পুলিশ ধরলে হয়তো বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে এখন দেশে এলে আর যদি ফিরতে না পারেন তাহলে বিপদ হয়ে যাবে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা কার্যকর আছে কি না সেটা আইসিপি বা জিডিআরএফএ সিস্টেমে গিয়ে নিজের ভিসার বর্তমান অবস্থা যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। নিয়োগকর্তার কাছ থেকেও নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভিসা সক্রিয় রয়েছে, এমিরেটস আইডির অবস্থা যাচাই করেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনেক কর্মী ভিসা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আগে থেকে জানতে পারেন না। ফলে বিমান টিকিট, ছুটির খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেকে আবার ভিসা হারানোর আশঙ্কায় দেশে আসছেন না। এতে পরিবারে মানসিক চাপও বাড়ছে।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

পাঠক প্রিয়