প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক লুটপাটের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন গ্রাহকদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা বাধ্য হয়ে এসব ব্যাংককে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তবে সেই প্রক্রিয়াও এখন থেমে আছে। ফলে বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক শুধু নামেই টিকে আছে। এর মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হতে রাজি না হওয়ায় ওই পাঁচ ব্যাংকের সব ধরনের অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
লুটপাট ও ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ফলে এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা পড়েছেন বড় বিপদে। ব্যাংকগুলো তাদের আমানতকারীদের কোনো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এই তালিকায় অপর তিনটি ব্যাংক হলো-ইউনিয়ন, গ্লোবাল ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।
ক্ষেত্রবিশেষ কয়েক হাজার টাকা তুলতে গিয়েও অনেক গ্রাহক চরম বিরক্ত হয়ে ফেরত আসছেন। তারা এই দুর্ভোগ আর কষ্টের কথা কাকে বললে সমাধান হবে তাও জানেন না। অনেক ব্যাংকের শাখা প্রধানের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করলেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
অনেকে ব্যাংকে গিয়ে হয়রান হয়ে কান্নাকাটি করেও ফেরত আসছেন। অনেকে গচ্ছিত টাকা ফেরত না পেয়ে ধারদেনা করে আর্থিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।
কজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মার্জারের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের সহায়তা বন্ধ রাখছে। তাই এক মাস ধরে কাউকে (গ্রাহক) কোনো টাকা ফেরত দিতে পারিনি। প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জন গ্রাহক জমানো টাকা চেয়ে খালি হাতে ফেরত যাচ্ছেন। এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা বেতনের ৫ হাজার টাকা যে হাতে তুলে দেব, সে ব্যবস্থাও নেই। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় গিয়েও দেখা যায় প্রায় অভিন্ন চিত্র।
দুর্বল ব্যাংক সংস্কার ও তারল্য সহায়তার পরও গ্রাহকের জমা অর্থ ফেরত দিতে না পারায় দীর্ঘদিন থেকে অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা হতাশায় ভুগছেন। স্কুল-শিক্ষক আবদুল কাদের এক লাখ ২৭ হাজার টাকা তুলতে ১৮ বার ইউনিয়ন ব্যাংকে গিয়েও এক হাজার টাকা হাতে পাননি। সাদ্দাম হোসেন দীর্ঘদিন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাওনা টাকা চেয়ে এক টাকাও পাননি। তিনি এখন হতাশ। এই চিত্র শুধু সাদ্দাম বা কাদেরের নয়, এটি এখন লাখ লাখ গ্রাহকের। ব্যাংকগুলোর ওপর তাদের আস্থায় চিড় ধরেছে।
এ চিত্র শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের। গ্রাহকরা বলছেন, দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও টাকা পাচ্ছেন না; বরং প্রতিনিয়ত তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা অজুহাতে। এই সংকট এখন আর শুধু আর্থিক নয়, এটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। চিকিৎসা, সন্তানের স্কুলের বেতন কিংবা ব্যবসার জরুরি প্রয়োজনেও টাকা না পেয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক শাখায় গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ৮ আগস্ট। এর পরই আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ১৪টি পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়, প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। সবল ব্যাংক থেকে টাকা ধারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ ও ঋণাত্মক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ডিমান্ড লোনে পরিবর্তন করা হয়।
এসব পদক্ষেপের ফলে ছোট অঙ্কের আমানতকারীরা প্রথমদিকে কিছু অর্থ তুলতে পারলেও বড় অঙ্কের সঞ্চয় ফেরত পাওয়া গ্রাহকের জন্য এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে পড়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো মাসে পাঁচ হাজার টাকাও দিতে পারছে না, তবে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন শাখা ব্যবস্থাপকরা।
টাকা ফেরত না পাওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতো বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কয়েক লাখ গ্রাহকের প্রতিদিনের বাস্তবতা। গত বছর ৫ আগস্টের পর এসব ব্যাংকে আমানত তোলার হিড়িক পড়েছিল। সেই চাপ এখনো সামলে উঠতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মার্জার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা ধাপে ধাপে সমস্যাগুলো সমাধান করছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে।


