প্রাইম ভিশন ডেস্ক »
নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের জন্য আলাদা নির্বাচন ও আচরণ বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। যেখানে প্রার্থীর জামানত বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনে পোস্টার, ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান যুক্ত করতে চায় ইসি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর আশাবাদ জানান। স্থানীয় সরকারের কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে, তা বাজেট পাওয়ার ওপর নির্ভর করছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, যেসব নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত বেশি বাজেট লাগে, সেগুলো পরের ধাপে সম্পন্ন করা হবে।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বিভিন্ন কথা বললেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইসিতে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল বুধবার বলেন, ‘আমরা সরকারের তরফ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি।’
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইসির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা হয়নি।
একাধিক সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ইউপি নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন হবে। শেষ ধাপে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হতে পারে। ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার ছাপানোর সরঞ্জাম ইসির কাছে রয়েছে। নির্বাচনের জন্য আলাদা আলাদা (ইউপি, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন) নির্বাচন ও আচরণ বিধিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে ইসি।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার বিধান বাতিল করে আইন সংশোধন করেছে সরকার। ফলে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে।
সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচন বিধিমালা ফরমে পরিবর্তন আনছে ইসি। দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিল করতে যাচ্ছে ইসি। ইভিএমে ভোট গ্রহণ এবং অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান বাদ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তা থাকবে না। আচরণবিধি সংশোধন করে নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার লাগানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কর্মকর্তা জানান, ইসির কাছে থাকা ভোটের সরঞ্জাম দিয়ে সিটি করপোরেশন, ইউপি বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্ভব। কোন নির্বাচন আগে, কোন নির্বাচন পরে হবে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখন থেকেই নিচ্ছে কমিশন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের জন্য সব সময় প্রস্তুত। নির্বাচন কবে হবে, তার ওপর নির্ভর করবে বাকি প্রস্তুতি। আমাদের দিক থেকে যে প্রস্তুতিগুলো আছে, সেটা কাস্টমাইজ করতে হয় কোন নির্বাচন আগে হবে, সেটার ওপরে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলে একধরনের প্রস্তুতি, পৌরসভার হলে আরেক ধরনের প্রস্তুতি। কারণ, ব্যালট পেপারের ভিন্নতা আছে।’
আগামী ৭ জুন থেকে শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশন। ওই অধিবেশন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের জবাবদানের জন্য সংসদ সদস্যরা ইতিমধ্যে সংসদ সচিবালয়ে প্রশ্ন জমা দিয়েছেন। সূত্র বলেছে, এসব প্রশ্নের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই প্রশ্নের জবাব প্রস্তুত করতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইসি ওই জবাব ইতিমধ্যে প্রস্তুতও করেছে।
ওই প্রশ্নের জবাবের বিষয়ে ইসির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, জবাবে কমিশন বলেছে, যেকোনো নির্বাচনের জন্য ইসির ৪৫ দিনের প্রস্তুতি লাগে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার জন্য যেসব বিষয় তারা পর্যালোচনা করে জবাবে সেগুলো বলা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব, আবহাওয়া—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সব নির্বাচন করতে ইসির ১০-১২ মাস সময় দরকার বলেও জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। যেহেতু নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, তাই নির্বাচন বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। এখানে কোনো পোস্টার থাকবে না, ইভিএম ব্যবহার হবে না। পোস্টাল ব্যালট থাকবে না। জামানত বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান থাকবে না।’
সূত্র বলেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ২০২৪ সালের মার্চে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা সংশোধন করে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা করা হয়। এটি বিবেচনায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থী, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানত বাড়াবে ইসি। ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্য ১ লাখ টাকা জামানত এবং পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জামানত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানতের সমপরিমাণ করা হতে পারে। ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা ও সদস্যদের জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা ইসির। এ বিষয়ে কমিশন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করবে। একই সঙ্গে খসড়া বিধিমালা ইসির ওয়েবসাইটে দিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে।


